শিশু আইনে বয়সসীমা পরিবর্তনের দাবি, ১৬-১৮ বছর বয়সিরাই বেশি অপরাধে জড়িত
শিশু আইনে বয়সসীমা পরিবর্তনের দাবি, গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

শিশু অপরাধে উদ্বেগজনক চিত্র: আইন কমিশনের গবেষণায় নতুন তথ্য

দেশে শিশু ও কিশোর অপরাধের হার নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে আইন কমিশনের সাম্প্রতিক গবেষণা। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সের শিশুরাই হত্যা, ধর্ষণসহ নানা গুরুতর অপরাধের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছে। অপরাধ সংঘটনের পর গ্রেফতার হয়ে দেশের দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অবস্থান করা শিশুদের উপর পরিচালিত এই গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সেমিনারে অংশীজনদের জোরালো দাবি

আইন কমিশন কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নিয়ে অংশীজনরা একবাক্যে বলছেন, ১৮ বছর পর্যন্ত সকল ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করার বর্তমান আইনি বয়স সীমার পরিবর্তন হওয়া জরুরি। এসব সেমিনারে বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর, আইনজীবী, পুলিশ, প্রবেশন কর্মকর্তা, সমাজকর্মী, সাংবাদিক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের প্রতিনিধিসহ মোট ১৫৪ জন তাদের মূল্যবান মতামত প্রদান করেন।

মতামত প্রদানকারীদের মধ্যে শতকরা ৯৪ ভাগই শিশু আইনে নির্ধারিত বয়সসীমা পরিবর্তনের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তারা দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেন যে, বর্তমান শিশু আইনে নানা অসঙ্গতি বিদ্যমান রয়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত আইনটি পর্যালোচনা করে এই অসঙ্গতিসমূহ দূর করা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

এ প্রসঙ্গে আইন বিশ্লেষক ও গবেষক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম বলেন, "আইনের সংস্পর্শে আসা শিশুদের নিয়ে গবেষণা রিপোর্ট দেখতে পেলাম। কিন্তু কেন তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তা এই রিপোর্টে স্পষ্টভাবে আসেনি। এজন্য পৃথক ও গভীর গবেষণা প্রয়োজন।"

তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, "আইনের সংস্পর্শে আসেনি এমন শিশু যারা অপরাধে জড়িত, তাদের সংখ্যা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু বিশেষ করে কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এখনই যদি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা না যায়, সমাজের ভারসাম্য ভঙ্গুর অবস্থায় চলে যাবে।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফউজুল আজিমের মতে, আইনি কাঠামোতে যেসব সীমাবদ্ধতা বেরিয়ে এসেছে, সেগুলো নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। প্রয়োজনে আইনের সংস্পর্শে আসা শিশুর মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বাস্তব চিত্র

দেশে বর্তমানে দুটি শিশু (বালক) উন্নয়ন কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে। একটি গাজীপুর জেলার টঙ্গীতে অবস্থিত, অপরটি যশোরের পুলেরহাটে। গত বছর এই দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে মোট ৮৭৩ জন শিশু অবস্থান করছিল। আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত এসব শিশুরা হত্যাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে এখানে অবস্থান করছেন।

গত বছর আইন কমিশনের গবেষণা দল দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে শিশুদের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হওয়ার তথ্য নিয়ে ব্যাপক গবেষণা পরিচালনা করেন। কমিশনের গবেষণায় প্রকাশ:

  • টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা ৩০০, কিন্তু সেখানে অবস্থান করছিল ৫৭৮ জন শিশু
  • পুলেরহাট শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা ৩০০, সেখানে অবস্থান করছিল ২৯৫ জন শিশু

দুটি কেন্দ্রে অবস্থানকারী শিশুদের বয়সভিত্তিক বণ্টন:

  1. ১০ থেকে অনূর্ধ্ব ১২ বছর বয়সি শিশু: ১ জন
  2. ১২ থেকে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সি শিশু: ২৫০ জন
  3. ১৬ থেকে অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সি শিশু: ৩৯৩ জন
  4. ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে: ৬৯ জন
  5. বয়স উল্লেখ নেই: ১৬০ জন

অপরাধের ধরন ও পরিসংখ্যান

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেফতার হয়ে দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অবস্থান করা শিশুদের মধ্যে:

  • হত্যার অপরাধে: ২০৫ জন
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে: ২০৪ জন
  • চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের অপরাধে: ১৫৩ জন
  • মাদকে: ৫০ জন
  • পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে: ৫ জন
  • আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধে: ৯ জন
  • বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে: ১৪ জন
  • অপহরণে: ১১ জন
  • মারামারিতে: ২৯ জন
  • অস্ত্র আইনে: ৩ জন
  • বিশেষ ক্ষমতা আইনে: ১ জন
  • অন্যান্য অপরাধে: ১৮৪ জন

এই তথ্য বিশ্লেষণ করে আইন কমিশন স্পষ্টভাবে বলছে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশুরাই হত্যা, ধর্ষণসহ নানা গুরুতর অপরাধের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত।

মনোবিজ্ঞানীর দৃষ্টিভঙ্গি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, "নানা পারিপার্শ্বিক কারণে শিশু-কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধ সংঘটনের পর তাদেরকে নিয়ে রাখা হচ্ছে সংশোধনাগারে। কিন্তু এসব সংশোধনাগারে শিশুদের অপরাধ প্রবণতা থেকে দূরে রাখার জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার, সেগুলো অনুপস্থিত।"

তিনি সতর্ক করে বলেন, "ফলে একটি গুরুতর অপরাধ করার পর শিশুটি সংশোধন না হয়ে মুক্তি পাওয়ার পর আরো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। শিশুদের অপরাধ প্রবণতা থেকে দূরে রাখতে এসব সংশোধনাগারকে উন্নত বিশ্বের আদলে গড়ে তুলতে হবে। যাতে একজন শিশু নিজেকে সংশোধনের সুযোগ পেয়ে সমাজ ও পরিবারের কাছে ভালো মানুষ হয়ে ফিরে যেতে পারেন।"

শিশুর সংজ্ঞায় বিভ্রান্তি

আইন কমিশন তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছে যে, দেশে বর্তমানে বলবত্ বিভিন্ন আইনে শিশুর সংজ্ঞায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে:

  • শিশু আইন, ২০১৩ এ শিশু বলতে অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এ অনধিক ১৬ বছর বয়সের ব্যক্তিকে শিশু এবং ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি ব্যক্তিকে কিশোর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে
  • দ্যা মেজরিটি অ্যাক্ট, ১৮৭৫ এর ৩ ধারামতে ১৮ বছরে উন্নীত হওয়া ব্যক্তিকে প্রাপ্তবয়ষ্ক ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে

এ প্রসঙ্গে শিশু আইন এবং দ্যা মেজরিটি অ্যাক্ট এর তুলনামূলক বিশ্লেষণে পরিলক্ষিত হয় যে, একই বয়সের ব্যক্তিকে শিশু আইনে শিশু হিসেবে এবং দ্যা মেজরিটি অ্যাক্টে প্রাপ্তবয়ষ্ক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একই বয়সের ব্যক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন আইনে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আখ্যায়িত করার ফলে প্রকৃতপক্ষে শিশুর আইনগত অধিকার রক্ষা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে গভীর সংশয় তৈরি হচ্ছে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ শিশু সনদের অনুচ্ছেদ ১ অনুসারে শিশু বলতে ১৮ বছরের কম বয়সি প্রতিটি মানুষকে বোঝায়, যদি না শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুসারে প্রাপ্তবয়স্কতা আগে অর্জন করা হয়। ফলে শিশুর বয়স সংক্রান্তে শিশু আইনের বিধান জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের বিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।