চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ৪৪ পুলিশ নিহত: তদন্তে বাধা ও আইনি জটিলতা
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ৪৪ পুলিশ নিহত, তদন্তে বাধা

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে পুলিশ হত্যা: তদন্তের পথে বাধা ও আইনি জটিলতা

চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের সময় ঢাকাসহ সারাদেশে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় হাজার হাজার ছাত্র-জনতা হতাহত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্যও প্রাণ হারান। এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে মোট ৪৪ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য নিহত হন, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি গভীর আঘাত হিসেবে রয়ে গেছে।

নিহতদের বিস্তারিত বিবরণ ও থানা-ভিত্তিক পরিসংখ্যান

পুলিশ সদর দফতরের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের সেই অভ্যুত্থানকালীন সময়ে সারাদেশে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সিরাজগঞ্জ জেলার এনায়েতপুর থানায় সংঘর্ষে একাই ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন, যা এই সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর মধ্যে একটি। এছাড়াও, ঢাকা মহানগরী ও আশুলিয়া এলাকাসহ বিভিন্ন থানায় ১৯ জন, গাজীপুরে ১ জন, কুমিল্লার তিতাস থানায় ২ জন, চাঁদপুরের কচুয়ায় ১ জন, নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে ২ জন, কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের ১ জন, হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ১ জন, নারায়ণগঞ্জ পিবিআইতে ১ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান।

তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও আইনি বাধার কারণ

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশ জনরোষের আশঙ্কায় গা ঢাকা দেয়, যার ফলে দেশের বহু থানা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে এবং ফাঁকা থানাগুলোতে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ছাত্র-জনতার হত্যাকাণ্ড নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করলেও পুলিশ হত্যার বিষয়টি দীর্ঘ সময় অগ্রাধিকার পায়নি। সে সময় তদন্তের দাবি উঠলেও তা কার্যকর হয়নি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে বিষয়টি আবার সামনে আসে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ হত্যার ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত থমকে যাওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন গণআন্দোলন চলাকালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের ফৌজদারি দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ। চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ের গেজেটের মাধ্যমে এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

মামলা ও তদন্তের বর্তমান অবস্থা

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশ হত্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি এবং চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা হয়েছে। অথচ নিহত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ৪৪ জন। রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট চাপ, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় শুধুমাত্র পুলিশ সদস্য আসামি রয়েছেন ১ হাজার ১৬৮ জন, যার মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৬১২টি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বর্তমানে ৬৮টি মামলা তদন্ত করছে, যেখানে ৯৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা আসামি রয়েছেন।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশ হত্যার তদন্ত নিয়ে কী বলা হয়েছে, সে বিষয়ে তার জানা নেই, তাই তিনি মন্তব্য করতে চাননি। তবে যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এসব হত্যাকাণ্ডে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়, তবে অগ্রগতি সম্পর্কে সময়মতো জানানো হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি ঘটনার গভীরে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা এখন সময়ের দাবি। পুলিশ বলছে, তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ও আলামত রয়েছে এবং ছাত্র-জনতা হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোরও দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাদের আইনের আওতায় আনার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।