ডেথ রেফারেন্স মামলায় মৃত্যুদণ্ড বাতিলের উচ্চ হার, নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা জোরালো
বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স মামলায় বাতিলের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৫৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে ৩৮টিতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ নামঞ্জুর হয়েছে, যা ৬৬.৬৬% বাতিলের হার নির্দেশ করে। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে ২২টি মামলার মধ্যে ১৯টিতে মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়েছে, যার হার ৮৬.৩৭%। মাত্র তিনটি মামলায় ফাঁসির আদেশ বহাল রয়েছে।
বিচারিক আদালতের সাজায় অসমতা ও অসামঞ্জস্য
আইন কমিশন উল্লেখ করেছে যে, ফৌজদারি আইনে অপরাধের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সাজার পরিমাণ নির্ধারিত থাকলেও, বিচারিক আদালতে সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধান বা নীতিমালার অভাব রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা আদালতের বিচারকরা নিজস্ব বিবেচনা ক্ষমতা অনুসারে সাজা নির্ধারণ করেন, যার ফলে আসামির সাজায় বিচারকভেদে অসমতা ও অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হচ্ছে। এই কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচারিক আদালতের দণ্ডাদেশ আপিল আদালতে রদ বা পরিবর্তিত হচ্ছে।
বিভিন্ন মামলায় সাজা পরিবর্তনের উদাহরণ
বিচারিক আদালতের সাজা হাইকোর্টে পরিবর্তনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো:
- রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলায় বিচারিক আদালত আট জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয় জনকে যাবজ্জীবন সাজা দিলে, হাইকোর্ট ২০২৩ সালের মে মাসে ১৪ আসামির মধ্যে নয় জনের সাজা কমিয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামির সাজা যাবজ্জীবনে পরিবর্তন করা হয়।
- ২০০৬ সালে জয়পুরহাট সদরের ধারকী গ্রামে আব্দুল মতিন হত্যা মামলায় জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাত জনকে মৃত্যুদণ্ড ও এক জনকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়। ২০২২ সালে ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে হাইকোর্ট এক আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে এবং বাকি ছয় জনের সাজা যাবজ্জীবনে হ্রাস করে।
- ২০১৩ সালে শাহ আলী থানার এএসআই হুমায়ুন কবির হত্যা মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও এক জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়। ২০২৩ সালে ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে হাইকোর্ট সব আসামিকে খালাস দেয়।
সাজা নির্ধারণে নীতিমালার প্রস্তাব ও আইনজীবীদের মতামত
আইন কমিশন ইতিমধ্যে সাজা পরিমাণ নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রেরণ করেছে। কমিশন বলছে, নীতিমালা থাকলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আসামির বয়স, চরিত্র, অপরাধের প্রভাব, এবং সংশোধনের সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায়সংগত সাজা প্রদান সম্ভব হবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বার কাউন্সিল এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, "আইনে এই বিধান বা নীতিমালা না থাকায় একই অপরাধে অনেক সময় সম্পৃক্ততা কম এমন ব্যক্তিও সর্বোচ্চ শাস্তি ভোগ করেন। নীতিমালা থাকলে একজন অপরাধীকে সঠিক ও ন্যায়সংগত সাজা প্রদান সম্ভব হবে।"
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শিশির মনির যোগ করেন, "সাজার নীতিমালা থাকলে উপযুক্ত অপরাধের জন্য অভিযুক্তকে উপযুক্ত শাস্তি প্রয়োগ করা যেত। ফলে একজন বিচারক তার মনমত বিচার করার সুযোগ পেত না। নীতিমালা প্রণয়ন করলে বিচার ও আসামিকে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে বৈষম্যও দূর হবে।"
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান
ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং সিংগাপুরের ফৌজদারি কার্যবিধিতে সাজার পরিমাণ নির্ধারণ বিষয়ক শুনানির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালে ল’ রিফর্ম অধ্যাদেশের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধিতে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পাঁচ বছর পর তা বাতিল করা হয়। বর্তমানে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৭(৫) ধারায় সাজা প্রদানের কারণ ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, অন্যান্য ধারায় সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যার বাধ্যবাধকতা নেই।
হাইকোর্ট 'রাষ্ট্র বনাম লাভলু' মামলায় বলেছে, ধর্ষণ, খুন, ডাকাতিসহ ফৌজদারি মামলায় চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার আগে পৃথক শুনানির মাধ্যমে সাজা নির্ধারণ করা দরকার। এই শুনানিতে অপরাধীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। আইন কমিশন ও আইনজীবীদের মতে, নীতিমালা প্রণয়ন হলে বিচার ব্যবস্থায় আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
