স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ: ৫ আগস্টের পরের মিথ্যা মামলা পর্যালোচনা ও প্রত্যাহারের আহ্বান
৫ আগস্টের পরের মিথ্যা মামলা পর্যালোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জরুরি নির্দেশ: ৫ আগস্টের পরের মামলা পর্যালোচনা ও প্রত্যাহারের আহ্বান

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছেন, যেখানে তিনি ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়ে দায়েরকৃত সকল মামলা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ বাহিনীকে আদেশ দিয়েছেন। গত সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সকল দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সাথে এক বৈঠকে তিনি এই নির্দেশনা প্রদান করেন।

মামলা দায়েরের পিছনে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর ভূমিকা

মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী অনেক নিরীহ মানুষকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলায় আসামি করেছে, যেখানে তাদের জড়িত থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। এই ব্যক্তিরা মিথ্যাভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে তারা অত্যন্ত মনঃকষ্টে জীবনযাপন করছেন। অনেকের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন নরকময় হয়ে উঠেছে, এবং তাদের আত্মীয়স্বজনও কোর্ট-কাচারি করতে করতে হয়রান ও পেরেশানির শিকার হচ্ছেন।

টিআইবির প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে যুক্ত ৮৩৭টি হত্যা মামলাসহ সমগ্র দেশে ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সংস্থাটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই 'পাইকারি হারে মামলা দায়ের' নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের হিসাবমতে, সমগ্র দেশে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার বৈশিষ্ট্য ও সমস্যা

এই সকল মামলার অধিকাংশই হত্যা মামলা এবং নির্দিষ্ট কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে অধিকাংশ আসামির নাম অজ্ঞাত হিসাবে রাখা হয়েছে। এমনকি, যারা এই মামলা দায়ের করেছেন, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামিদের চেনেন না, এবং আসামি বা বাদীরা বিবাদীদের চেনেন না। তাদের ঠিকানা ভিন্ন, এমনকি দূরদূরান্তের। টাকাপয়সা দিলে মামলা থেকে নাম কর্তনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, না দিলে অব্যাহত হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাপের মুখে সঠিক তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণ করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও স্বীকার করেছিল যে, এই অধিকাংশ মামলা টিকবে না। সরকার ডিসিদের কাছে এই ব্যাপারে আবেদন জানানোর আহ্বান জানায় এবং সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের নাম প্রত্যাহারের ব্যাপারে আশ্বাস দেওয়া হয়; কিন্তু সেই আশ্বাস অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার উদ্বেগ

হয়রানি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক এই মামলা দায়েরের কারণে দেশের জনমনে তো বটেই, আন্তর্জাতিক মহলেও নানা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। মানবাধিকারের দিক থেকে এটি খুবই দুঃখজনক। এইরূপ ঢালাও মামলা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। যারা জুলাই গণহত্যা বা খুনখারাবির সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, এটি সকলের কাম্য; কিন্তু যেসব নিরপরাধ ব্যক্তি পাইকারিভাবে মামলা দায়েরের কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তাদের এই অন্যায্য, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা থেকে অবশ্যই রেহাই দিতে হবে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা

যেকোনো মামলা সুনির্দিষ্ট হওয়াই বাঞ্ছনীয়। হত্যাকাণ্ডের মামলা হলে কে, কোথায়, কীভাবে ও কেন মার্ডার করেছেন, তার সকল কিছু সুস্পষ্ট করে নথিতে উল্লেখ করা প্রয়োজন; কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডে ১০০ থেকে ১৫০ জনের নাম উল্লেখ করা হাস্যকর ও অগ্রহণযোগ্য। অনেক সময় রাজনীতিবিদদের হেয় করার জন্য তথা তাদের মানসম্মান ধুলায় লুটিয়ে চরিত্র হরণের জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এমন মামলা দায়েরের বহু নজির রয়েছে। এই অপসংস্কৃতি প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে চলছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এইরূপ জঘন্য মনমানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

শেষ কথা: অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি

অতএব, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের পর দেশে যেসব ঢালাও, গায়েবি, মিথ্যা ও সাজানো মামলা দায়ের করা হয়েছে, তা পর্যালোচনাপূর্বক অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক। একজন নিরীহ মানুষও যেন মিথ্যা মামলার কারণে অবিচারের শিকার না হন, সেই দিকে নতুন সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী, এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন শীঘ্রই তার কাছে জমা দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।