সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা: জিয়াউল আহসানকে 'সিরিয়াল কিলার' বলার কারণ ব্যাখ্যা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ চলমান একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া আজ সোমবার তৃতীয় দিনের মতো জেরার মুখোমুখি হয়েছেন। এই মামলার একমাত্র আসামি সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়, যার উপস্থিতিতেই সাক্ষী ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা চলে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আগামী রোববার শুনানির পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছেন, সেদিনও ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে জেরা করা হবে।
জিয়াউল আহসানকে 'সিরিয়াল কিলার' বলার ভিত্তি
আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনির জেরায় ইকবাল করিম ভূঁইয়া জানান, তিনি জিয়াউল আহসানকে 'সিরিয়াল কিলার' আখ্যায়িত করার পেছনে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'আমি জিয়াউল আহসান সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনাক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে উনি একজন সিরিয়াল কিলার। এই বিভিন্ন মাধ্যমের কোনো একটি তথ্য লিখিত নয়।' মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এমআই) এবং পার্সোনাল সার্ভিসে (পিএস) জিয়াউল আহসান সম্পর্কে 'সিরিয়াল কিলার' মর্মে উল্লেখ ছিল কি না, এমন প্রশ্নে তিনি উত্তর দেন, 'আমার মনে নেই। আমার অধস্তনরা আমার মৌখিক নির্দেশের প্রেক্ষিতে নির্দেশ পালন সম্পর্কে আমাকে মৌখিকভাবে জানাতেন।'
লিখিত ব্যবস্থা নিতে না পারার কারণ
ইকবাল করিম ভূঁইয়া দাবি করেন, জিয়াউল আহসান সিরিয়াল কিলার জানার পর তিনি লিখিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, কারণ আহসান তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলেন। তিনি বলেন, 'জিয়াউল আহসান সিরিয়াল কিলার জানার পর আমি লিখিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিনি। কারণ, সে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।' তবে তিনি অপকর্ম থেকে বিরত রাখতে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে জানান, 'ডিএমআই জগলুল (জগলুল আহমেদ, পরিচালক মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স) এবং সিওএএসইউ (কমান্ড্যান্ট, আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ) দায়িত্ব দিয়েছিলাম তাঁকে অপকর্ম থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়ার জন্য।'
পদোন্নতি ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বক্তব্য
প্রথম দিনের জেরায় ইকবাল করিম বলেছিলেন, তিনি মেজর জেনারেল মোমেনকে (আনোয়ারুল মোমেন) ডেকে জানিয়েছিলেন যে জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার এবং তিনি তার পদোন্নতির পক্ষে নন। আজকের জেরায় তিনি আরও বলেন, সেনাপ্রধান থাকাকালীন জিয়াউল আহসানের প্রভাবে তার ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুলকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যত্র পোস্টিং করা হয়েছে, যদিও এই ঘটনার সময়কাল তিনি স্মরণ করতে পারেননি। তিনি উল্লেখ করেন, 'মাঝে মাঝে নিজের জন্মতারিখও মনে থাকে না।'
ইকবাল করিম ভূঁইয়া ২০১২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ে জিয়াউল আহসান র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদে ছিলেন। পরবর্তীতে আহসানকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল করে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক, এনটিএমসির পরিচালক এবং মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি হারান এবং গ্রেপ্তার হন।
এই মামলায় ইকবাল করিম ভূঁইয়া প্রথম সাক্ষী হিসেবে ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি জবানবন্দি দিয়েছিলেন, যার পর থেকে তার জেরা চলছে। আদালতের কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে, এবং ভবিষ্যত শুনানিতে আরও তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
