ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম এই মাসকে ইসলামী ঐতিহ্যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ১২ মাসের মধ্যে চারটি মাসকে ‘আশহুরে হুরুম’ বা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন, আর মহররম সেই চার মাসের একটি। রাসুলুল্লাহ (সা.) মহররমকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। ইসলামী ইতিহাসে এমন মর্যাদা অন্য কোনো মাসকে দেওয়া হয়নি।
আশুরার অর্থ ও তাৎপর্য
এই মহিমান্বিত মাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিন হলো ১০ মহররম, যা ‘ইয়াওমে আশুরা’ নামে পরিচিত। আশুরা শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ দশ। অর্থাৎ মহররমের দশম দিনই আশুরা। তবে ইসলামী ঐতিহ্যে এই দিনের গুরুত্ব কেবল একটি তারিখের গুরুত্ব নয়, বরং এটি বহু নবী-রাসূলের স্মৃতি, আল্লাহর রহমত, সত্যের বিজয় এবং মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির সঙ্গে জড়িত একটি দিন।
আশুরার সঙ্গে জড়িত নবীদের ঘটনা
ইসলামী সূত্রসমূহে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন নবীর জীবনে সংঘটিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আশুরার দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও এসব ঘটনার সবগুলো সমমানের সহিহ সূত্রে বর্ণিত নয়, তবুও মুসলিম ঐতিহ্যে প্রচলিত রয়েছে যে, হজরত আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল, হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা তুফান থেকে নিরাপদে জুদি পাহাড়ে অবতরণ, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আগুন থেকে মুক্তি, হজরত ইউনুস (আ.)-এর মাছের পেট থেকে উদ্ধার এবং হজরত আইয়ুব (আ.)-এর রোগমুক্তির মতো ঘটনাগুলো আশুরার দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বর্ণিত হয়েছে। যদিও এসব বর্ণনার অনেকগুলো ইতিহাস ও ফজিলতের পরিসরে আলোচিত হয়, ইসলামের মৌলিক শিক্ষায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হলো হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তির ঘটনা।
হজরত মুসা (আ.)-এর মুক্তির স্মৃতি
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমনের পর লক্ষ্য করলেন যে ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। তিনি তাদের কাছে কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, এই দিন আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) এবং তার অনুসারীদের ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। সেই মহান নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের জন্য হজরত মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে বেশি।’ এরপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশ দেন।
এই হাদিস ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম নিজেকে পূর্ববর্তী নবীদের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখে। ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্ম নয়, বরং আদম (আ.) থেকে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবীর তাওহিদের দাওয়াতেরই চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ রূপ। আশুরার রোজা সেই ধারাবাহিকতার একটি জীবন্ত নিদর্শন।
আশুরার রোজার ফজিলত
আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম) এখানে যে গুনাহের কথা বলা হয়েছে, আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে এর দ্বারা সাধারণত ছোট গুনাহ বোঝানো হয়েছে। বড় গুনাহ থেকে তওবা করা আবশ্যক। তবুও এই হাদিস আশুরার রোজার মর্যাদা কত বড়, তা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।
রোজা পালনের নিয়ম
প্রথমদিকে আশুরার রোজা মুসলমানদের জন্য বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হতো। পরবর্তীতে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল হিসেবে থেকে যায়। তবে এর মর্যাদা কখনো কমে যায়নি। বরং রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ দিকে মুসলিম পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য নির্দেশনা দেন যে শুধু ১০ মহররম নয়, এর সঙ্গে ৯ মহররমও রোজা রাখা উত্তম। তিনি বলেন, ‘আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম) এই কারণে ফকিহরা ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুই দিন রোজা রাখাকে উত্তম বলেছেন। অনেকে তিন দিন ৯, ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখাকেও মুস্তাহাব মনে করেন।
ইমাম নববী (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থে লিখেছেন, আশুরার রোজা সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং এটি মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। একইভাবে ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) আশুরার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। ইসলামের চার মাযহাবের আলেমরাও আশুরার রোজার বিশেষ গুরুত্বের ব্যাপারে একমত।
কারবালার ঘটনা
তবে আশুরার আলোচনা কেবল রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের ইতিহাসে এই দিন আরেকটি মর্মস্পর্শী ঘটনার কারণে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে কারবালার ঘটনা। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। তার শাহাদাত মুসলিম ইতিহাসে গভীর বেদনার অধ্যায় হয়ে আছে। ফলে আশুরা একদিকে যেমন হজরত মুসা (আ.)-এর বিজয়ের স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগের স্মৃতিকেও ধারণ করে।
ইসলামী দৃষ্টিতে আশুরা পালন
তবে ইসলামী আকিদা ও সুন্নাহর আলোকে আশুরার মূল ইবাদত হলো রোজা পালন, আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া এবং আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবায়ে কিরাম থেকে এ দিনকে শোক, মাতম বা বিশেষ আনুষ্ঠানিকতায় রূপ দেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং তারা এই দিনকে ইবাদত, কৃতজ্ঞতা ও আত্মসমালোচনার দিন হিসেবে পালন করেছেন।
আশুরার শিক্ষা ও প্রাসঙ্গিকতা
আশুরা আমাদের শেখায় যে সত্য কখনো পরাজিত হয় না। কখনো তা হজরত মুসা (আ.)-এর মাধ্যমে ফেরাউনের বিরুদ্ধে বিজয়ের রূপ নেয়, আবার কখনো ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগের মাধ্যমে নৈতিক বিজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে অত্যাচারীরা শক্তিশালী ছিল, কিন্তু তাদের নাম ঘৃণার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, আর যারা সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারা যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন।
আজকের বিশ্বে যখন মানুষ ভোগবাদ, স্বার্থপরতা এবং নৈতিক সংকটের মুখোমুখি, তখন আশুরার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঈমান কেবল বিশ্বাসের নাম নয়, বরং নীতি, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকার নাম।
আশুরা তাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়। এটি ইতিহাসের দর্পণ, ইবাদতের এক মহিমান্বিত উপলক্ষ, নবীদের সংগ্রামের স্মারক এবং মানবতার জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা। যুগ বদলায়, সভ্যতা বদলায়, কিন্তু আশুরার শিক্ষা কখনো পুরোনো হয় না। কারণ সত্য, ধৈর্য, আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা এসব মূল্যবোধের কোনো মেয়াদ নেই, এগুলো মানবতার চিরন্তন সম্পদ।



