আদালতে বাংলা ভাষার পূর্ণ প্রয়োগ এখনও অধরা: আইনি পরিভাষার সংকট ও ঐতিহাসিক অভ্যাস
বিচারপ্রার্থীদের বোধগম্য ভাষায় বিচারকার্য পরিচালনার দাবি দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক ও আইনি প্রত্যাশা। এই লক্ষ্য পূরণে সময়ে সময়ে উচ্চ আদালতে মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহারে কিছু পরিবর্তন এলেও, সমস্ত ক্ষেত্রে এখনও তার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ সম্ভব হয়নি। মূলত আইন-আদালতকেন্দ্রিক কিছু ইংরেজি শব্দের উপযুক্ত বাংলা প্রতিশব্দের অভাব এবং দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার কারণে, বিচারালয়ে ইংরেজি ভাষার ওপর নির্ভরশীলতা রয়েই গেছে।
সংবিধান ও আইনের বিধান সত্ত্বেও বাস্তবতার পার্থক্য
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি সংবিধানের ১৫৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইংরেজি ও বাংলার মধ্যে কোনও বিরোধ দেখা দিলে বাংলাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ১৯৮৭ সালের ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’-এর ৩ ধারায় সরকারি অফিস ও আদালতের সমস্ত চিঠিপত্র, সওয়াল-জবাব এবং আইনগত কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই আইন অমান্য করলে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের দায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও বিদ্যমান।
তবে বাস্তবে আদালত অঙ্গনের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন এবং জটিল। বিশেষ করে উচ্চ আদালতে এখনও লাতিন ও ইংরেজি ভাষার এমন কিছু শব্দের ব্যবহার নিয়মিতভাবে হয়, যার যুতসই বাংলা অর্থ আইনজীবীদের কাছেও সহজলভ্য নয়। এই পরিস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
আইনজীবীদের পর্যবেক্ষণ: প্রযুক্তি ও প্রজন্মের ভূমিকা
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, "বর্তমানে অনেক বিচারক রায় বাংলায় লিখছেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আদালত পরিচালনা করা হয় বাংলায়। কিন্তু মামলার আরজি বা আবেদন এখনও মূলত ইংরেজিতেই লেখা হয়।" এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, দেশি-বিদেশি অধিকাংশ আইন ও কনভেনশন ইংরেজিতে প্রণীত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, "আইনের অনেক শব্দমালার প্রমিত বাংলা আমরা ভালো করে জানি না। সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার জন্য ইংরেজি ও লাতিন শব্দগুলোর বাংলা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।"
প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটলেও আইনি পরিভাষাগুলোর উপযুক্ত ভাষান্তরের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এই প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল টুলস এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পথ: তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় ইংরেজি ভাষার যে প্রয়োগ রয়েছে, তা রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, "এজন্য একটি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে এটি সম্ভব হতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মানসিকতা প্রয়োজন।"
মনজিল মোরসেদ আরও বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টে বাংলার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের অবসান আগেই হয়েছে। এখন অনেক রায় বাংলায় দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বিশেষ অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে ইংরেজি রায়গুলোও বাংলায় রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, আদালতে বাংলা ভাষার পূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোর ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে:
- আইনি পরিভাষার প্রমিত বাংলা অভিধান প্রণয়ন ও প্রচলন
- প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাষান্তর প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ
- আইন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি
- তরুণ আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি
এই প্রচেষ্টাগুলো বাস্তবায়িত হলে, বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি অধিকতর স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, যা সংবিধানের মৌলিক নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
