ঢাকার হাজারীবাগে সোহেল হত্যা মামলায় স্ত্রী শিল্পী বেগম ও ফাহিম পাঠানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
হাজারীবাগে সোহেল হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাকার হাজারীবাগে সোহেল হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাকার হাজারীবাগে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে সংঘটিত সোহেল হাওলাদার হত্যা মামলায় তাঁর স্ত্রী শিল্পী বেগম ও ফাহিম পাঠানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ বুধবার ঢাকার দশম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এই রায় ঘোষণা করেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী ফারুকুল ইসলাম দেওয়ান এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

আদালতের রায়ের বিস্তারিত বিবরণ

ফারুকুল ইসলাম দেওয়ান জানান, রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে প্রত্যেককে আরও এক বছর করে কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় ফাহিম পাঠানকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয় এবং পরে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, শিল্পী বেগম পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

হত্যাকাণ্ডের পটভূমি ও তদন্তের তথ্য

২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হাজারীবাগের মধ্য বছিলা এলাকা থেকে সোহেল হাওলাদারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হাজারীবাগ থানার উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম মামলা করেন। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন নিহত ব্যক্তির স্ত্রী শিল্পী বেগম, তাঁর ছেলে সিজান মাহমুদ এবং সিজানের বন্ধু ফাহিম পাঠান। পরে ২০২২ সালের ২৪ জুলাই শিল্পী বেগম ও ফাহিম পাঠানকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা হাজারীবাগ থানার পরিদর্শক হুমায়ন কবির। সিজান মাহমুদ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাঁর বিচার শিশু আদালতে চলছে।

অভিযোগপত্রে উল্লিখিত ঘটনার বিবরণ

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, শিল্পী বেগমের তৃতীয় স্বামী ছিলেন সোহেল হাওলাদার। তাঁরা হাজারীবাগে বসবাস করতেন। শিল্পীর ছেলে সিজানও মায়ের সঙ্গে থাকত এবং সোহেলকে ‘মামা’ বলে ডাকত। তবে সোহেল তাকে পছন্দ করতেন না এবং মাঝেমধ্যে মারধর করতেন। শিল্পী বেগমকেও তিনি মারধর করতেন। এ কারণে সিজান তার বাবার কাছে বাগেরহাটে চলে যায়।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সোহেল সিজানের বাবার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেন। পরে চাকরির ব্যবস্থা না হওয়ায় বিরোধ তৈরি হয়। ২০২০ সালের ২০ জুলাই সোহেল সিজানকে ফোন করে বাগেরহাট মাজারে দেখা করেন এবং চাকরির জন্য তাকে ঢাকায় আসতে বলেন। ৩ সেপ্টেম্বর সিজান ঢাকায় আসে। ১০ সেপ্টেম্বর টাকার বিষয় নিয়ে শিল্পী বেগমের সঙ্গে সোহেলের ঝগড়া হয় এবং তাঁকে মারধর করা হয়।

রাতে বাসায় ফিরে বিষয়টি টের পায় সিজান। পরে সে এই ঘটনা তার বন্ধু ফাহিম পাঠানকে জানায়। তারা সোহেলকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে। ১৩ সেপ্টেম্বর শিল্পী বেগম শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে সোহেলকে খাওয়ান। সন্ধ্যা সাতটার দিকে সিজান ও ফাহিম বাসায় এসে শিল্পী বেগমকে বাসা থেকে চলে যেতে বলে। শিল্পী বেগম তাঁর বোনের বাসা মোহাম্মদপুর নবোদয় হাউজিং এলাকায় চলে যান। পরে সিজান ও ফাহিম সোহেলের দুই পা বেঁধে, মুখ চেপে ধরে এবং গলা কেটে হত্যা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়া ও রায় ঘোষণা

২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল শিল্পী বেগম ও ফাহিম পাঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে আদালত ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। আত্মপক্ষ শুনানি ও যুক্তিতর্ক শেষে আজ এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এই রায়ে আদালত হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শিল্পী বেগম ও ফাহিম পাঠানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একটি কঠোর শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।