মানিকগঞ্জে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা, বাজার কমিটির দাবি আত্মহত্যা
মানিকগঞ্জে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা, বাজার কমিটির দাবি আত্মহত্যা

মানিকগঞ্জে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা, বাজার কমিটির দাবি আত্মহত্যা

মানিকগঞ্জের তরা বাজারে চোর সন্দেহে মাছ ব্যবসায়ী কৃষ্ণ রাজবংশীকে প্রকাশ্যে হাত-পা বেঁধে আটকে রেখে নির্যাতনের পর পরিবারের কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। টাকা দিতে না পারার পর তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন নিহতের স্বজনরা। তবে বাজার কমিটির একটি পক্ষ বলছে, অপমান সইতে না পেরে ওই ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন।

ঘটনাটি ঘিরে পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, চুরির অভিযোগ থাকলেও কাউকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে না দিয়ে প্রকাশ্যে আটকে রেখে নির্যাতন ও অর্থ দাবি করার অধিকার কারও আছে কিনা।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) নিহতের বাড়ি ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার তরা বাজার ঘুরে পরিবারের সদস্য, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাজার কমিটির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মৃত কৃষ্ণ রাজবংশী সদর উপজেলার বান্দুটিয়া মাঝিপাড়া এলাকার ক্ষুদিরাম রাজবংশীর ছেলে। তিনি স্থানীয় বাজারে মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

স্ত্রীর অভিযোগ

মৃতের স্ত্রী যমুনা রানী রাজবংশীর স্পষ্ট অভিযোগ, বুধবার (৬ মে) দিবাগত রাত ৩টার দিকে তার স্বামী মাছ কিনতে বাজারে যান। সকালে খবর পান, তাকে বাজারে আটকে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, বাজারে গিয়ে দেখি আমার স্বামীকে এমনভাবে মারা হয়েছে যে, দাঁড়ানোরও শক্তি ছিল না। হাত-পা প্রায় ভেঙে ফেলা হয়েছিল। আমি কাঁদতে কাঁদতে তাদের বলেছি, ওকে ছেড়ে দেন। তখন তারা বলে- মাছ চুরি করেছে, ৪০ হাজার টাকা দিলে ছাড়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কমিটির লোকজনের কাছে স্বামীর প্রাণভিক্ষা চেয়েছি। কয়েক দিন সময় দিলে টাকা জোগাড় করে দেব বলেছি; কিন্তু তারা কোনো কথা শোনেনি। পরে বাড়িতে টাকা জোগাড় করতে যাই। বিকাল ৫টার দিকে খবর পাই আমার স্বামী মারা গেছে। আমার স্বামী আত্মহত্যা করেনি, তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভাইয়ের বক্তব্য

মৃতের ছোট ভাই বিষ্ণ রাজবংশী বলেন, আমার ভাইকে এমনভাবে মারা হয়েছিল যে, তার নিজের দাঁড়ানোর শক্তিও ছিল না। সে ফ্যানের সঙ্গে গামছা বেঁধে আত্মহত্যা করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য না। তাকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে।

ঘটনার পটভূমি

স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের অভিযোগে জানা যায়, কয়েক দিন আগে তরা বাজারের একটি মাছের আড়ত থেকে তিন কার্টন চিংড়ি মাছ চুরির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার জেরে বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টার দিকে কৃষ্ণ রাজবংশীকে ধরে বাজারের সমিতির ঘরে আটকে রাখা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তাকে মারধর করা হয় এবং পরিবারের কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

বাজার কমিটির দাবি

তবে তরা মৎস্য আড়ত সমবায় সমিতির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, প্রকাশ্যে মারধর ও অপমানের কারণে কৃষ্ণ রাজবংশী অফিস ঘরে ফ্যানের সঙ্গে গলায় গামছা প্যাঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন।

ঘটনার বিষয়ে তরা বিল্টু স্মৃতি হাট-বাজারের উপদেষ্টা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, আমি বেলা ১১টার দিকে বাজারে এসে দেখি মাছ চুরির অভিযোগে কৃষ্ণ রাজবংশীকে হাত বেঁধে সমিতির ঘরের নিচতলায় রাখা হয়েছে। পরে পরিবারের লোকজনকে ডেকে এনে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলি। এরপর আমি সমিতির ঘরের দ্বিতীয় তলায় মিটিংয়ে যাই। পরে শুনি সে আত্মহত্যা করেছে।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বাজারের ভেতরে কাউকে আটকে রেখে মারধরের ঘটনা নতুন নয়। তবে এবার একজনের মৃত্যু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

নেতাদের অনুপস্থিতি

এ ঘটনায় বাজার কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। সভাপতির মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

পুলিশের অবস্থান

মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন বলেন, খবর পেয়ে বুধবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল থেকে কৃষ্ণ রাজবংশীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) মহরম আলী সাংবাদিকদের বলেন, তরা বণিক সমিতির অফিস থেকে কৃষ্ণ রাজবংশীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার প্রস্তুতি চলছে। প্রয়োজনে জড়িতদের গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান চালানো হবে।

এদিকে মৃতের পরিবার জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, আইনের শাসন থাকলেও কেন এখনো প্রকাশ্যে মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে।