মারকাযু শাহাবুদ্দিন আল ইসলামি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও ইসলামি বক্তা মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী তার দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ এক পোস্ট দিয়েছেন। বুধবার (৬ মে) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি আমার আল্লাহকে ভয় করি.. গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে চাই। এই চাওয়াটাই আমাকে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে— দ্বিতীয় বিয়ে।’
প্রথম স্ত্রীর গর্ভাবস্থায় বিয়ে কেন?
সবচেয়ে বেশি আপত্তি তোলা হচ্ছে— কেন প্রথম স্ত্রীর গর্ভাবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করলেন আলোচিত এ ইসলামী বক্তা। এর জবাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বৃহস্পতিবার (৭ মে) ‘কিছু বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের জবাব!’ পোস্ট দিয়েছেন মাদানী। তার পোস্টটি হুবহু দেওয়া হলো:
প্রেমের গুজব খণ্ডন
কিছু লোক বলার চেষ্টা করছে, আমি নাকি আমার প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় এই মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে চাপে পড়ে বিয়ে করেছি। আবার অনেক নির্লজ্জরা তো বলছে টিকটকে নাকি পরিচয়, মাআযাল্লাহ! আল্লাহকে হাজির-নাজির রেখে বলছি, এই মেয়েকে বিয়ের দিন দেখার আগ পর্যন্ত আমি জীবনে কোনোদিন দেখিনি, এমনকি তার সঙ্গে একবারের জন্য কথাও হয়নি, আর টিকটকে জীবনে কোনদিন আমার আইডি ছিল না।
আইএমভির মাধ্যমে বিয়ের প্রক্রিয়া
সবচেয়ে বেশি আপত্তি তোলা হচ্ছে— কেন স্ত্রীর প্রেগন্যান্সির সময় বিয়েটা করতে হলো? আমার মানবিক মূল্যবোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। দেখুন আমি বিয়েটা করেছি আইএমভির মাধ্যমে। সেখানে যারা স্বেচ্ছায় একাধিক বিয়ে করতে আগ্রহী— ছেলে বা মেয়ে— তাদের ফরম পূরণ করতে হয়। আমার ফরম পূরণ করা হয়েছিল কয়েক মাস আগে। এরপর তারা কুফু অনুযায়ী মিলে গেলে ছেলে ও মেয়ের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে। উভয়পক্ষ রাজি হলে বিয়ে সম্পন্ন হয়। আমি সেই সময়ই আমার প্রথম স্ত্রীকে ফরম পূরণের বিষয়টি জানিয়েছিলাম। অতএব, আইএমভি শুধু বিবাহের মধ্যস্থতাকারী। আমার জন্য উপযুক্ত মেয়ে পাওয়ার সময়টা আমার স্ত্রীর প্রেগন্যান্সির সময়ের সঙ্গে মিলে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আমিও দ্বিধান্বিত ছিলাম, সিদ্ধান্ত নিতেও কষ্ট হয়েছে।
প্রথম স্ত্রীর প্রতি যত্ন
তবে এরপর আমার কার্যক্রম কী ছিল? আমি সারাক্ষণ স্ত্রীর পাশে হাসপাতালে থেকেছি। ময়মনসিংহের সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন— ৪ দিন ছিলাম রাত-দিন আমার ঘুম ছিল না, ঠিকমতো খাওয়াও হয়নি। যেদিন আমার স্ত্রীর অপারেশন হয়েছে, সেদিন অপারেশনের পর সারা রাত তার বিছানার পাশে বসে থেকেছি। রাত ৩টার দিকে নার্সরাই আমার জন্য মায়া করে বলেছে, ‘হুজুর, আপনার স্ত্রী ভালো আছেন, আপনি বসে না থেকে এবার একটু ঘুমান।’ আর এগুলো শুধু প্রেগন্যান্সির সময়ের বিষয় না। আড়াই বছরের সংসারে আমার স্ত্রী যদি ন্যূনতম একবারও আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে থাকে— পৃথিবীর কেউ যদি সেটা প্রমাণ করতে পারে, আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিষয়টি শুনে কষ্ট পেয়েছে, কান্না করেছে, হতাশ হয়েছে, আমার ওপর রাগও করেছে। কিন্তু যারা আমার মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের বলছি— তাদের কাছেই যান, তারা কোনোভাবেই বলতে পারবে না যে আমি জীবনে একদিনও আমার স্ত্রীর যত্ন নিইনি। আমার বাড়িতে কিংবা আশেপাশে এসে জিজ্ঞেস করুন— আমি আমার স্ত্রীর কতটুকু যত্ন করি। অনেকে আমাদের দেখে বলে, আমরা নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দাম্পত্য জীবন পার করছি। বিষয়টি আমার ও শ্বশুরবাড়ি— উভয় জায়গাতেই পরিচিত। তার সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য কাজের লোক রাখা, প্রেগন্যান্সির সময় রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের হাতে তার পা টিপে দেওয়া, যখন যা চেয়েছে তা এনে দেওয়া— আহ! আফসোস, আজ আমাকে সেগুলোও প্রকাশ্যে বলতে হচ্ছে! এত কিছু বলার পরও, আমার এই হালাল ও বৈধ সিদ্ধান্তের কারণে আজ নিজের ভেতরেও একধরনের অপরাধবোধ জন্মেছে। তবে সেটার জন্য আমি একজন মানুষের কাছেই দায়ী— তিনি আমার প্রথম স্ত্রী। তার কাছে আমি কীভাবে আগের মতো হতে পারি, সেটাই আমার ইনসাফের মাধ্যমে প্রমাণ হবে, ইনশাআল্লাহ।
মামুনুর রশীদ কাসেমীর প্রসঙ্গ
মামুনুর রশীদ কাসেমীর এখানে কেন? দেখুন, আইএমভি কী করছে? তারা শুধু এমন দুই পক্ষকে মিলিয়ে দিচ্ছে, যারা স্বেচ্ছায় একাধিক বিয়েতে আগ্রহী। তারা তো কাউকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে না। বরং আইএমভি অনেক বিধবা, অসহায় কিংবা আশ্রয়হীন মেয়েদের জন্য আশ্রয়ের একটি ব্যবস্থা তৈরি করছে— সেখানে গেলে বুঝতে পারবেন। আর মামুনুর রশীদ কাসেমী চারটি বিয়ে করেছেন— আপনি তার স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলে দেখুন। তারা যদি সন্তুষ্ট ও সুখী থাকেন, তাহলে আপনার সমস্যা কোথায়? তার নামে যে স্ত্রী মামলা দিয়ে তাকে জেলে ভরেছিল সে এখন কোথায়? সেও তো মামুনুর রশীদ কাসেমীর বিল্ডিংয়ে খবর নেন! নাকি সমস্যা হলো— আপনি ঘরে একজন স্ত্রী রেখে বাইরে আরও কয়েকজনের সঙ্গে ডেটিং করবেন, কিন্তু সবাই কেন সেটা করবে না? আর যদি বলেন, একাধিক বিয়ের বিষয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কি জায়েজ?— তাহলে বলব, এটা আমি বা আপনি সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয় না। দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় মুহাক্কিক আলেমগণ এ বিষয়ে কথা বলবেন।
সমালোচকদের প্রতি বার্তা
শেষ কথা, সমালোচনাকারীদের বড় একটি অংশ মূলত আল্লাহর কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একাধিক বিয়ের বিধানকেই অপছন্দ করে। তারা সমাজে জিনার মাধ্যমে যৌন চাহিদা পূরণকে সহজ মনে করে, তাই সমালোচনা করে। তবে কিছু মানুষের বাস্তবসম্মত সমালোচনা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। বিঃদ্রঃ এ দেশের অনেক আলেমবিদ্বেষী মানুষ এপস্টিন ফাইলস বা বড়লোক বড় নেতাদের স্ত্রী রেখে ৫টা ৭টা রক্ষিতা নিয়েও এত কথা বলেনি, যতটা আমার একাধিক বিয়ে নিয়ে বলছে। তাদের কাছে মনে হয়, এপস্টিন ফাইলসের সেই ছোট ছোট শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বা বড় নেতাদের রক্ষিতা রাখার চেয়েও আমার দ্বিতীয় বিয়ে বড় অপরাধ!



