স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে: আইনে কী আছে?
স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে: আইন কী বলে?

সম্প্রতি মারকাযু শাহাবুদ্দিন আল ইসলামি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও ধর্মীয় আলোচক মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এই ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের আইনে কি স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যায়?

হাইকোর্টের রায় কী?

২০২২ সালের জানুয়ারিতে একজন আইনজীবী দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর দেওয়াকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। তিনি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক করার আবেদন জানান। তবে ২০২১ সালের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রিটটি খারিজ করে দেয়। ফলে মুসলিম পারিবারিক আইনের আগের নিয়মই বহাল থাকে। গত ডিসেম্বরে রিটের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলেন, পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়ার নিয়মে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে নিবন্ধিত হবে না। আবেদনের সঙ্গে বিদ্যমান স্ত্রীর সম্মতি নিশ্চিত করতে হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ বলেন, ‘পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না’ বলে যে প্রচার চলছে তা সম্পূর্ণ ভুল। হাইকোর্টের রায়ে স্ত্রীর সম্মতিসহ আরবিট্রেশন কাউন্সিলের মাধ্যমেই বিয়ের অনুমতির পদ্ধতিকে যৌক্তিক বলা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুনরায় বিয়ে ও আরবিট্রেশন কাউন্সিল

আইনজীবীরা জানান, ফৌজদারি দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা অপরাধ। তবে সালিশি পরিষদের সিদ্ধান্ত থাকলে এটি কার্যকর হবে না। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় তা বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হবে এবং অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী পুনরায় বিয়ের জন্য আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে না। ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন অনুযায়ী বিয়ে রেজিস্ট্রেশন না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সালিশি পরিষদ গঠন ও সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশে বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে সালিশি পরিষদের অনুমতি বাধ্যতামূলক। আবেদন করতে হয় স্ত্রী বা শেষ স্ত্রীর এলাকার চেয়ারম্যানের কাছে। তিনি আবেদন পাওয়ার পর আবেদনকারী স্বামী ও তার স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রতিনিধি মনোনয়ন করতে বলেন। চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধিদের মিলেই সালিশি পরিষদ গঠিত হয়। তারা আলোচনা করে দেখেন যে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও বিয়ের আবেদনটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত কিনা।

পুনরায় বিয়ের আবেদনের সঙ্গে তিনটি বিষয় থাকতে হবে: সরকারি ফি, দ্বিতীয় বিয়ের কারণ ব্যাখ্যা এবং বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি আছে কিনা। এগুলোর ভিত্তিতে কাউন্সিল আবেদনটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত মনে করলে শর্তহীন বা শর্তযুক্ত অনুমতি দিতে পারে।

হাইকোর্টের রায়ের ব্যাখ্যা

হাইকোর্ট তার রায়ে বলেছে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারার অধীনে আরেকটি বিবাহের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয়। এই আইন কোনো পক্ষের অধিকার খর্ব করে না এবং সালিশ পরিষদের জন্য বহুবিবাহের অনুমতি প্রদান বা প্রত্যাখ্যানে কোনো প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে না। আদালত আরও বলেছে, সালিশ পরিষদ বিবাহের কোনো পক্ষের ওপর একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।

ব্যতিক্রম ক্ষেত্র

মিতি সানজানা জানান, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে কিছু ব্যতিক্রম উল্লেখ আছে, যেখানে স্ত্রীর সম্মতি না থাকলেও আরবিট্রেশন কাউন্সিল পুনরায় বিয়ের অনুমতি দিতে পারে। যেমন: বন্ধ্যত্ব, শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা, বা স্ত্রী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিখোঁজ থাকলে।

আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইকোর্টের রায়ে মুসলিমদের পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতির বিধানই বহাল রাখা হয়েছে। তাই ‘স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে’—এমন দাবি সঠিক নয়।