১৫ বছর বয়সে বাল্যবিয়ের শিকার হন বাবা-হারা আঁখি আক্তার। বিয়ের সময় যৌতুক দেওয়া হয় ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেই স্বামী ও সৎ শাশুড়ির অমানসিক নির্যাতনে তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই তিনি কন্যা সন্তানের মা হন। কিন্তু সন্তানের জন্ম তার জীবনে সুখ না এনে আরও নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন করে ৫০ হাজার টাকা যৌতুকের চাপ শুরু হয়।
জীবন বাঁচাতে প্রতিবেশীদের পরামর্শে সন্তানকে নিয়ে তিনি আশ্রয় নেন ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী চর যাত্রাপুরে তার অসহায় মায়ের কাছে। স্বামী মাঝে মধ্যে যাতায়াত করলেও ভরণপোষণ বন্ধ করে দেন। এভাবে কেটে যায় দুই বছর। একপর্যায়ে স্বামী ফোনে জানিয়ে দেন, যৌতুকের টাকা না দিলে দ্বিতীয় বিয়ে করবেন।
নিরুপায় আঁখি তখন স্থানীয় এক নারীর মাধ্যমে লিগ্যাল এইডের বিনামূল্যে আইনি সহায়তার কথা জানতে পারেন। পরে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে গিয়ে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’র মাধ্যমে সমস্যার সমাধান পান। আপোষ-মীমাংসার পর স্বামী মজিদুল ইসলাম স্ত্রী-সন্তানকে বাড়িতে নিয়ে যান। বর্তমানে তাদের সংসার স্বাভাবিকভাবে চলছে।
একইভাবে নির্যাতনের শিকার হন কিশোরী সুমাইয়া আক্তার। বাল্যবিয়ের পর স্বামীর কাছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ‘গায়ের রঙ’ নিয়ে কটূক্তি, পরপর দুই কন্যা সন্তানের জন্ম—সব মিলিয়ে তার দাম্পত্য জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। একপর্যায়ে দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি।
গ্রাম্য সালিশে সমাধান না হওয়ায় সুমাইয়া তার বাবাকে নিয়ে কুড়িগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যান। সেখানে একাধিক শুনানি ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তার স্বামী সংসার করতে রাজি হন। পরে পারিবারিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে সুমাইয়াকে ঘরে তুলে নেন। বর্তমানে তারাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে কুড়িগ্রাম জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন আঁখি ও সুমাইয়া। তারা জানান, সরকারি এই সেবা কীভাবে তাদের জীবনে নতুন আশা ফিরিয়েছে।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ ভগবতী রানী জানান, গত এক বছরে কুড়িগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে ৬৫৪টি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ১২৭টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই পারিবারিক নির্যাতনসংক্রান্ত।
‘সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে দিবসটি উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা, লিগ্যাল এইড মেলা ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
জেলা ও দায়রা জজ মোছাম্মৎ ইসমত আরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীসহ বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, মামলা জট কমাতে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষদের জন্য লিগ্যাল এইড অফিস বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিয়ে বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।



