সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করতে আরও ছয় মাস সময় পেয়েছে বিভিন্ন এজেন্সির অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সময় পেল টাস্কফোর্স। সময় চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ রোববার এ সময় দেন।
শুনানি ও ছয় মাস সময়
শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, আলোচিত সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতিবিষয়ক প্রতিবেদন ইতিমধ্যে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেন, প্রতিবেদনটি আজ এসেছে। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘তারা (টাস্কফোর্স) সময় চেয়েছে। তদন্ত এন্ড স্টেজে। মামলার তৎকালীন তদন্তসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের রিচ করা যাচ্ছে না।’ আদালত বলেন, ‘এন্ড স্টেজে, এন্ড হয়নি।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘অগ্রগতি প্রতিবেদন কী আমরা পেতে পারি, দেখতে পারি।’ আদালত বলেন, ‘দেখবেন? দেখে দিয়ে দেবেন।’ এরপর বেঞ্চ কর্মকর্তা প্রতিবেদনটি শিশির মনিরকে দেন। প্রতিবেদন দেখে পরে তিনি তা ফেরত দেন। প্রতিবেদনটি হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করা হলে ভালো হয় বলে আদালতে উল্লেখ করেন রিট আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। আদালত বলেন, জিজ্ঞাসা করা দরকার বলে প্রতিবেদনে এসেছে। একপর্যায়ে ছয় মাস সময় চান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস। এ সময় শিশির মনির বলেন, তিন মাস সময় দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আদালতে উপস্থিত হতে বলা যেতে পারে। পরে আদালত ছয় মাস সময় দেন।
তদন্তের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই মূল চ্যালেঞ্জ
নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ১২ বছর ৬ মাস ১৫ দিন পর্যন্ত র্যাব এই মামলার তদন্ত করেছে বলে বর্তমান তদন্তকারী টাস্কফোর্স জানিয়েছে। তদন্তের পুরো সময়ে আটজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর মধ্যে সাতজন কারাগারে আছেন। একজন জামিনে গিয়ে পলাতক হয়েছেন। সর্বশেষ এই মামলার অভিযুক্ত একজন হুমায়ুনকে (বাড়ির দারোয়ান) আদালতের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট টাস্কফোর্স গঠনের আদেশ দেন। এই প্রসঙ্গ টেনে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, টাস্কফোর্স গঠনের পর ইতিপূর্বে দুবার আদালতে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আজকে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ টাস্কফোর্স তিনবার অগ্রগতি প্রতিবেদন দিয়েছে।
অগ্রগতি প্রতিবেদন সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ঘটনার (২০১২ সাল) সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, অন্যান্য দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তি, ওই সময়ে পুলিশ প্রশাসনের তদন্তকারী সংস্থা ও এমনকি অন্যান্য সংস্থায় যাঁরা দায়িত্বরত ব্যক্তি ছিলেন, তাঁদের কারও কাছে বর্তমান টাস্কফোর্স অ্যাকসেস পাচ্ছেন না। ওই সময়কালে সচারচর টেলিভিশনে সব সময় পরিচিত যে মুখগুলো দেখতাম ৫ আগস্টের পর তাঁদের...পাইনি। তবে ঘটনা ২০১২ সালের, টাস্কফোর্স গঠনের আদেশ হচ্ছে ২০২৪ সালের। প্রতিবেদন দিচ্ছি ২০২৬ সালে।
যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রথম কথা ক্রাইম সিন উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এখন যাঁরা টাস্কফোর্সে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরা কিন্তু ঘটনার অব্যবহিত (তাৎক্ষণিক) পরে সেখানে যাননি। তাঁরা যখন দায়িত্ব পেয়েছেন, তখন কিন্তু ক্রাইম সিন বলে কোনো সিন নাই। তবু টাস্কফোর্সে যাঁরা দায়িত্বে আছেন, তাঁরা আন্তরিকভাবে বিস্তরিত প্রতিবেদন আদালতে দিয়েছেন।...তবে মূল যে সমস্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, সেটি হচ্ছে, একটি ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করতে গেলে তার একটা চেইন থাকে, একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারছেন না টাস্কফোর্স। কারণ, ওই সময়ে যাঁরা প্রাথমিকভাবে তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন, তথ্য-প্রমাণ নিয়েছেন, কিংবা সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, কিংবা সাক্ষীদের বাইরে আসামিদের গ্রেপ্তার করেছেন, তাঁদের কাছ থেকে যেসব তথ্য পেয়েছেন, তার কোনো নিয়মতান্ত্রিক হস্তান্তর টাস্কফোর্সের কাছে হচ্ছে না। সেসব তথ্যের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো অ্যাকসেস পাচ্ছেন না। এটি হচ্ছে মূল বাধা। এই বাধার বিষয়টি আদালতে বলেছি। সেটি শুনে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ছয় মাস সময় দিয়েছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আজ প্রায় ১৪ বছর হয়ে গেল, হত্যার রহস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদ্ঘাটন করতে পারছে না।...টাস্কফোর্স গঠনের পর সময় নেওয়া হয়েছে। আজকে এসে তারা (টাস্কফোর্স) রিপোর্ট দিয়ে বলছেন আরও অমুক অমুককে জিজ্ঞাসা করতে হবে। যাঁদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তাঁরা বলছেন, তাঁদের আসলে জিজ্ঞাসা করা সম্ভব নয়। কারণ, তাঁরা মিসিং। তাঁরা দেশে নেই। তাঁদের খুঁজে পাচ্ছেন না। আমরা-আপনারা সবাই তাঁদের নাম জানি। পটপরিবর্তনের পরে যে লোকগুলোর সঙ্গে কথা বলবেন বলে ইন্ডিকেট করেছেন অগ্রগতি প্রতিবেদনে, সেই লোকগুলো বাংলাদেশের সীমার মধ্যে নেই।...যাঁদের কথা তারা এখানে বলছেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, র্যাবের ডিজি ও একজন সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁরা কথা বলতে চান। এই যে কথা বলতে চান, তাঁরা তো বাংলাদেশের সীমার মধ্যে নেই। চার-পাঁচটা জায়গায় তাঁরা কতগুলো না, না, না বলেছেন।.. তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বলেছেন তারা এখনো মোটিভ খুঁজে পান নাই, ক্লু খুঁজে পান নাই, কেন তাঁদের হত্যা করা হলো। দাম্পত্য কলহ, বলছে না। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, বলছে না। পেশাজীবী কোনো কাজ, বলছে না। জমি-জমার কোনো বিষয়, বলছে না।..এটি আমাদের সবার জন্য বিস্ময়কর যে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, সবাই ব্যর্থতার পরিচয় দেবে।
সবাই মিলে একটা ব্যর্থতার দিকে অগ্রসর হচ্ছি মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, ‘...ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে, যাঁদের সঙ্গে কথা বলবেন, বলছেন, তাঁদের ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না।...শেষ পর্যন্ত টাস্কফোর্সও যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আমাদের যাওয়ার জায়গা নাই। তবে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস তাদের (টাস্কফোর্স) সমর্থন করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এটি তাঁরা আগামী ছয় মাসের মধ্যে কার্যে পরিণত করে দেখাবেন। তাহলে আমরা আশাবাদী হব।’



