অনেক দেরিতে হলেও সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটাকে ভুক্তভোগী পরিবারের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি বলা যেতে পারে। সেনানিবাসের মতো একটি সুরক্ষিত এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ও বিচারহীনতার দীর্ঘ ১০ বছর—সব মিলিয়ে আলোচিত এ হত্যা মামলার প্রতীকী তাৎপর্যও বহুমাত্রিক।
গত বুধবার মামলার অন্যতম আসামি সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে পাঠানোর সংবাদ প্রকাশের পর তনুর পরিবার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগ ও বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এতে এটা সুস্পষ্ট, ভুক্তভোগীর স্বজন ও নাগরিকদের সামষ্টিক স্মৃতিতে বিচারহীনতার ক্ষতটা কতটা গভীর। আমরা আশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে।
পরিবারের আশা ও প্রত্যাশা
সোহাগী জাহান তনুর পরিবার কখনো বিচারের আশা ছাড়েনি। এক আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর মা আনোয়ারা বেগম বলেছেন, ‘আশায় ছিলাম, একদিন না একদিন খুনির বিচার হবে।’ সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সন্তান হত্যার বিচার পাওয়ার জন্য একজন মায়ের বছরের পর বছর অপেক্ষা করে থাকার ঘটনা আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়াটা কতটা কঠিন। বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণও এর সবচেয়ে বড় কারণ।
ঘটনার বিবরণ
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করাতে গিয়ে আর বাসায় ফিরে আসেননি ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছে ঝোপের মধ্যে তাঁর লাশ পাওয়া যায়। দুই দফা ময়নাতদন্ত করেও মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। ২০১৭ সালের মে মাসে তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব খুঁজে পায় সিআইডি। সে সময় সন্দেহভাজন তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করে সিআইডির একটি দল।
এর পর থেকে এ মামলার বিচারিক অগ্রগতি কার্যত রুদ্ধ হয়ে যায়। প্রতিবছর ২০ মার্চ তনু হত্যাকাণ্ডের দিনটাতে স্বজনদের আর্তি আর বিচার প্রত্যাশার দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডটির বিচার। ৬ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিআইবি সন্দেহভাজন তিনজনের ডিএনএ নমুনা মেলানোর অনুমতি চায়। আদালত সেই অনুমতি দেওয়ায় মামলাটির অচলাবস্থার অবসান হয়। এ মামলার অপর দুই আসামি হলেন ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলম।
বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি
এক আসামির গ্রেপ্তার এ মামলার এক ধাপ অগ্রগতি। তবে ডিএনএ ম্যাচিংসহ সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন এবং অভিযোগপত্র গঠনসহ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম দ্রুততম সময়ের মধ্যে শুরু করা প্রয়োজন। এমনিতেই ১০ বছর পেরিয়ে গেছে, বিচার আরও বিলম্ব হলে তা ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে অন্তরায় হয়ে উঠবে।
আলোচিত অন্যান্য হত্যাকাণ্ড
শুধু তনু নয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীসহ আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলো বিচারহীনতার দৃষ্টান্ত ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতীক হয়ে রয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে আলোচিত এসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা অত্যন্ত জরুরি।
আমরা আশা করি, নাগরিক আকাঙ্ক্ষা ও সংবেদনশীলতাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার যেকোনো গোষ্ঠীচাপের ঊর্ধ্বে থেকে তনু, ত্বকী, সাগর-রুনিসহ আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগই ভুক্তভোগী পরিবার ও নাগরিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে।



