কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এই মামলায় গ্রেফতারকৃত সন্দেহভাজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের পর সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া আরও দুই সন্দেহভাজন সদস্যকে খুঁজছে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ
বৃহস্পতিবার বিকালে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা কার্যালয়ের পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলাটি একাধিক সিনিয়র অফিসার তদারকি করছেন। ডিএনএ বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, তাই কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তায় বুধবারই গ্রেফতার হাফিজুর রহমানকে ঢাকায় ল্যাবে নিয়ে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
গ্রেফতার ও রিমান্ড
মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি বাসা থেকে হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করে পিবিআই। বুধবার বিকালে তাকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোমিনুল হক তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে শনিবার বা রোববার তাকে আবার আদালতে হাজির করা হবে।
আরও দুই সন্দেহভাজনের সন্ধান
তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, সন্দেহভাজন আরও দুইজনকে খোঁজা হচ্ছে। তবে রিমান্ডে পাওয়া কোনো তথ্য সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তদন্ত দল তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পেয়েছিল, কিন্তু পরে সেগুলো সন্দেহভাজন কারও সঙ্গে মেলানো হয়নি।
আদালতের আদেশে ডিএনএ ক্রস-ম্যাচ
গত ৬ এপ্রিল এই মামলায় তিন সন্দেহভাজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচ করার জন্য আদালতে আবেদন করে পিবিআই। আদালতের আদেশ পেয়েই তাদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়। হাফিজুর রহমানের গ্রেফতারের মাধ্যমেই প্রথম সন্দেহভাজনের ডিএনএ ক্রস-ম্যাচের নমুনা নেওয়া হলো। বাকি দুইজন গ্রেফতার হলে তাদেরও ডিএনএ নমুনা নেওয়া হবে।
ঘটনার বিবরণ
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করাতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে বহু খোঁজাখুঁজির পর সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছে একটি জঙ্গলে তার মরদেহ পাওয়া যায়। পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্তের ধারা
শুরুতে থানা-পুলিশ, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ও পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত করেও রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। দুই দফায় ময়নাতদন্তেও তনুর মৃত্যুর কারণ উল্লেখ ছিল না। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পান পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া
দেরিতে হলেও মামলার তদন্তে গতি আসায় ন্যায়বিচারের আশা দেখছে তনুর পরিবার। তনুর বাবা ও মামলার বাদী ইয়ার হোসেন বলেন, দশ বছর ধরে পুরো দেশবাসী মেয়েটির বিচারের জন্য অপেক্ষায় ছিল। তিনি শুরু থেকেই জড়িতদের নাম বলে আসছেন। মেয়ে হত্যার বিচার প্রভাবিত করতে দুই দফায় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেও মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তাই ডিএনএ প্রতিবেদনের মাধ্যমে পিবিআই হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত ও বিচার নিশ্চিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।



