তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামির রিমান্ড, আদালতে বাবা-মায়ের স্বস্তি ও বিচারের দাবি
তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামির রিমান্ড, আদালতে স্বস্তি

তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামির রিমান্ড শুনানি, আদালতে পরিবারের স্বস্তি

কুমিল্লার আদালত প্রাঙ্গণে বুধবার সন্ধ্যায় দেখা গেল তনুর বাবা ইয়ার হোসেন, মা আনোয়ারা বেগম ও ভাই আনোয়ার হোসেন (রুবেল)কে। দূর থেকেই তাদের চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল। গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে তনুর বাবা ‘বিচার চাই বিচার চাই, খুনিদের বিচার চাই’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘তনু খুনের ১০ বছর পার হয়েছে। এই ১০ বছর পর একজন খুনিরে আজ কাঠগড়ায় দেখলাম। আমার চোখে শান্তি লাগছে।’

প্রথম গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের আদেশ

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান ওরফে তনু হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো এক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। বুধবার বিকেল চারটার দিকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মো. মুমিনুল হকের আদালতে গ্রেপ্তার সাবেক সেনাসদস্যকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। পরে শুনানি শেষে ওই আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রাজধানীর কল্যাণপুরের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রিমান্ড শুনানি শেষে সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে ঢাকায় নিয়ে যায় পিবিআই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রেপ্তারের পটভূমি ও পরিবারের প্রতিক্রিয়া

এর আগে মঙ্গলবার ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুরকে আটক করেন পিবিআইয়ের সদস্যরা। এরপর তাঁকে তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার বিকেলে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হয়। গ্রেপ্তার বর্তমানে ৫২ বছর বয়সী হাফিজুর রহমান ২০২৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে গেছেন। তনু হত্যার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পিবিআইয়ের সদস্যরা আদালত ত্যাগ করার পর আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার সময় তনুর বাবা, মা ও ভাই প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন। তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমি কখনো বিচারের আশা ছাড়ি নাই। আশায় ছিলাম একদিন না একদিন খুনিরার বিচার হইব। যাক অবশেষে একটা খুনি ধরা পড়ল। আমার মেয়েরে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করছে তারা। আমি তারার ফাঁসি চাই। দেশবাসী যেন কইতে পারে তনু হত্যার ফাঁসি হইছে।’

আনোয়ারা বেগম আরও বলেন, ‘দীর্ঘ এই সময়ে সাংবাদিকেরা আমরার লগে আছিলো। নাইলে কবেই আমরারে তুলার মতো তুলাধুনা কইরালাইতো। মৃত্যুর আগে আমার একডাই ইচ্ছা, খুনিডির ফাঁসি দেখতাম চাই। বাকি খুনিডির দ্রুত গ্রেপ্তার চাই।’

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেক অপেক্ষার পর আজকে চোখের শান্তি পাইছি। দেখলাম খুনি হাফিজুর আদালতের কাঠগড়ায়। গত ১০টি বছর ধরে যেখানেই গিয়েছি, মানুষ শুধু বলত তনু হত্যার বিচার কি হবে না? যাক, অবশেষে বিচার পাব বলে কিছুটা হলেও আশা জেগেছে। এখন মানুষকে বলতে পারব, একটা খুনি ধরা পড়ছে। আমি কোর্টকে মান্য করি, শ্রদ্ধা করি। আশা করি দীর্ঘদিন পরে হলেও তনু ন্যায়বিচার পাবে।’

অন্যান্য সন্দেহভাজন ও তদন্তের অগ্রগতি

ইয়ার হোসেন আরও উল্লেখ করেন, আরও দুজন খুনি এখনো ধরা পড়েনি। বিশেষ করে খুনের মূল হোতা সার্জেন্ট জাহিদ এবং সৈনিক জাহিদকে গ্রেপ্তার করা জরুরি। সার্জেন্ট জাহিদ গ্রেপ্তার হলেই সব বেরিয়ে আসবে। তার স্ত্রীও এই খুনে জড়িত। হত্যার সময় তনুর চুল কেটে ফেলা হয়েছিল। ওই নারীই চুল কেটেছে। ঘটনার পর তিনি খুনিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সময়ে তাঁকে কারও নাম উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি।

এর আগে ৬ এপ্রিল ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আদালতের তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কুমিল্লায় আসেন। এ সময় তিনি মামলার অগ্রগতি জানানোর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনের ডিএনএ নমুনা মেলানোর আবেদন করেন। আদালত তাঁর আবেদনে সম্মতি দেন।

গ্রেপ্তার হাফিজুর রহমান ছাড়া অপর দুজন হলেন ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলম। তাঁরা বর্তমানে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে আছেন। তবে মামলার বাদী ও তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের দাবি, সৈনিকের নাম শাহীন আলম নয়, জাহিদ হবে। তাঁরা ঘটনার শুরু থেকেই নামগুলোর কথা বলে আসছেন। শাহীন নামে কোনো সৈনিকের কথা তাঁরা তখন জানেননি, সৈনিক জাহিদের নামটি বারবার আলোচনায় এসেছে।

তদন্তের বিস্তারিত ও ঐতিহাসিক পটভূমি

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসায় অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে তনু হত্যা মামলা গ্রেপ্তার দেখিয়ে কুমিল্লার আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। আসামিকে ঢাকায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আশা করা হচ্ছে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়া যায়। তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। পরদিন তাঁর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।

এই হত্যাকাণ্ডের শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এ ছাড়া তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে ওই সময়ে তাঁদের নাম গণমাধ্যমকে জানায়নি সিআইডি।