গুম মামলায় আদালতে সাক্ষীর জবানবন্দি: শেখ হাসিনাকেই দায়ী করলেন মাসরুর আনোয়ার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ গুম ও নির্যাতনের মামলায় সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী বুধবার (২২ এপ্রিল) আদালতে দৃঢ়ভাবে দাবি করেছেন যে, তার গুম, নির্যাতন ও ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই দায়ী। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে জেরার সময় তিনি এই অভিযোগ উত্থাপন করেন, যা শেখ হাসিনার পক্ষের আইনজীবী আমির হোসেনের পূর্ববর্তী দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
আইনজীবীর দাবি প্রত্যাখ্যান ও সাক্ষীর জবাব
মামলায় পলাতক শেখ হাসিনার প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী আমির হোসেন জেরায় দাবি করেছিলেন যে, তার মক্কেল গুম-নির্যাতনের ঘটনায় দায়ী নন এবং ক্যারিয়ার নষ্টের জন্য সাক্ষী নিজেই দায়ী। এছাড়া, তিনি অভিযোগ করেন যে মাসরুর ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে অসত্য সাক্ষ্য দিচ্ছেন। জবাবে মাসরুর আনোয়ার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "গুম-নির্যাতন ও আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য শেখ হাসিনাই দায়ী। কোনোভাবেই আমি দায়ী নই। ট্রাইব্যুনালে অসত্য কোনো সাক্ষ্য দেইনি।" তার এই বক্তব্য আদালত কক্ষে গুরুত্বপূর্ণ আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ফেসবুক পোস্ট ও গুমের কারণ নিয়ে বিতর্ক
জেরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ফেসবুকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে লেখার বিষয়টি। মাসরুর আনোয়ার দাবি করেন যে, মোদিবিরোধী পোস্ট দেওয়ার কারণেই তাকে গুম করা হয়েছিল। তিনি জানান, আটকের পর তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সেই পোস্ট দেখানো হয়েছিল, কিন্তু মুছে ফেলতে বলা হয়নি বা তিনি নিজেও তা সরিয়ে নেননি। তবে, তার অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডসহ সব তথ্য কর্তৃপক্ষ নিয়ে নেয়, যা আর ফেরত দেওয়া হয়নি।
এ সময় আইনজীবী তাবারক হোসেন পাল্টা দাবি করেন যে, মাসরুরকে জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে আটক করা হয়েছিল, মোদিবিরোধী পোস্টের জন্য নয়। মাসরুর এই দাবি "সত্য নয়" বলে প্রত্যাখ্যান করে পুনরায় জোর দেন যে, শুধুমাত্র পোস্টের জন্যই তাকে আটক করা হয় এবং জঙ্গি কার্যক্রমে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
টিএফআই সেল ও অন্যান্য অভিযোগের জবাব
জেরায় মাসরুর আনোয়ারকে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল পরিদর্শন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কথিত যোগাযোগের বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, এ সংক্রান্ত সব কথা অসত্য এবং তিনি কোনো গল্প বা নাটক তৈরি করেননি। এছাড়া, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মসজিদ তৈরির অর্থ সংগ্রহ সম্পর্কে তাবারক হোসেনের জিজ্ঞাসাবাদে মাসরুর ব্যাখ্যা দেন যে, তিনি সহকর্মী ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে মসজিদ তৈরি করেছিলেন, এবং এর আড়ালে অন্য কোনো তৎপরতা চালানো হয়নি।
আইনজীবী তাবারক আরও দাবি করেন যে, মাসরুর 'মুক্তি পরিষদ' নামক সংগঠনের নেতৃত্বস্থানীয় সদস্য, যা জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। মাসরুর এই অভিযোগও অস্বীকার করে বলেন, "মুক্তি পরিষদের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই এবং কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে জিয়াউল হককে বরখাস্তের খবরটিও আমার জানা নেই।"
মামলার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম
এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জন আসামি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ জন সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে আটক আছেন এবং বাকিরা পলাতক। বুধবারের শুনানিতে তিন নম্বর সাক্ষী মাসরুর আনোয়ারের জেরা শেষ হয়েছে, এবং ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৪ মে তারিখ নির্ধারণ করেছেন। এই মামলা দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।



