নরসিংদীতে সালিশ বৈঠকে টাকার বিনিময়ে ধর্ষণের অভিযোগ মীমাংসার প্রস্তাব ওঠায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ১৭ বছরের এক কিশোরী। পরে ঘরের দরজা ভেঙে ঝুলন্ত কিশোরীকে উদ্ধার করেন পরিবারের সদস্যরা।
শুক্রবার (২২ মে) বিকালে সদর উপজেলার সোনাতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ওই কিশোরী মুমূর্ষু অবস্থায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অভিযোগের বিবরণ
অভিযোগ উঠেছে, ওই কিশোরীকে বিয়ের কথা বলে তার স্বামীর বাড়ি থেকে এনে কয়েক দফা ধর্ষণের পর এখন বিয়ে করতে চাচ্ছেন না অভিযুক্ত তরুণ।
কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা জানান, এক বছর ধরে অভিযুক্ত নাইমের সঙ্গে ওই কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। নাইমের কাছে তাকে বিয়ে দিতে রাজি ছিল তার পরিবার; কিন্তু ছেলের পরিবার এ বিয়েতে রাজি না থাকায় এক মাস আগে তাকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়া হয়। তবে নাইম নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন মেয়েটির সঙ্গে। বিয়ের কথা বলে তাকে স্বামী-সংসার ছেড়ে চলে আসতে বলেন নাইম। পরে ১০ মে এক বন্ধুর সহায়তায় স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়েটিকে নিয়ে আসেন নাইম। এ ঘটনায় স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায় মেয়েটির। এরপর বিয়ের প্রলোভনে কয়েক দফা তাকে ধর্ষণ করেন নাইম।
এসব ঘটনা এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর দ্রুত নাইমকে বিয়ে করতে চাপ দেন ওই কিশোরী; কিন্তু নাইম এখন আর মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতা চাইলে গতকাল শুক্রবার বিকালে বসা সালিশে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় ঘটনাটি মীমাংসার আলোচনা হয়; কিন্তু তা মেনে নিতে পারেননি ওই কিশোরী।
আত্মহত্যার চেষ্টা ও উদ্ধার
সালিশের প্রস্তাবে অপমানিত বোধ করে কিশোরী বাড়িতে গিয়ে ঘরের দরজা আটকে গলায় ফাঁস নেন। ওই সময় পরিবারের সদস্যরা ঘরের দরজা ভেঙে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। সেখানে নেওয়ার পর আইসিইউ খালি না থাকায় অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিরা
সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাজহারুল হক (টিটু), ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আওলাদ হোসেন (মোল্লা), বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। তারা সবাই বিয়ের পক্ষে মত দিলেও বিয়ের পরিবর্তে মেয়েকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় মীমাংসার প্রস্তাব দেন ছেলেপক্ষের লোকজন। এসব প্রস্তাব সহ্য করতে না পেরে ওই কিশোরী গলায় ফাঁস নেন।
আওলাদ হোসেন মোল্লার বক্তব্য
জেলা বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লা বলেন, উভয়পক্ষের অনুরোধে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। ওই সালিশে আমরা সবাই বিয়ের পক্ষে মত দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই চলে এসেছি। পরে ছেলেপক্ষের লোকজন টাকা দিয়ে মীমাংসার প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যেই সালিশ শেষ হওয়ার আগেই মেয়ে বাড়িতে গিয়ে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। ঘটনার পর থেকে আমি হাসপাতালে মেয়েটির পাশেই অবস্থান করছি।
কিশোরীর মায়ের বক্তব্য
ওই কিশোরীর মা বলেন, বিয়ের কথা বলে নাইম আমার মেয়ের সংসার ভাঙছে। কয়েক দফা ধর্ষণ করেছে। এখন সে বিয়ে করতে চায় না। গতকালের সালিশে বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে টাকার বিনিময়ে মীমাংসার কথা ওঠায় তা সহ্য করতে পারেনি আমার মেয়ে। অপমান সইতে না পেরে সে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। হাসপাতালের বেডে আমার মেয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে।
পুলিশের বক্তব্য
নরসিংদী মডেল থানার ওসি এমআর আল মামুন বলেন, অন্যত্র বিয়ে হওয়ার ১৫ দিন পর ওই মেয়েকে বিয়ের প্রলোভনে স্বামীর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল প্রেমের সম্পর্কে থাকা তরুণ। তবে এখন আর মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না তিনি। এ ঘটনা স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টার মধ্যেই ওই কিশোরী গতকাল আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। ঘটনাটি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।



