প্রতারণার মামলায় শারমিন আক্তার একার হয়ে কারাগারে যাওয়া সেই নারীর পরিচয় আদালতকে জানিয়েছে পুলিশ। একার হয়ে কারাগারে যাওয়া ওই নারীর নাম ভাবনা আক্তার। তিনি একার ফুফাতো বোন। তার ফুফু লাইলী আক্তার মুন্নি মেয়ের পক্ষে ভাবনাকে আদালতে নিয়ে আসেন।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে এমনটায় তুলে ধরেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম।
আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কী বলা হয়
আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১২ মে একা ও লাইলী শাহনাজ খুশি নামে দুই আসামি আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করে। আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর একার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য গত ১৪ মে নির্ধারণ ছিল। ওইদিন একার রিমান্ড ও জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়।
এরপর বাদী পক্ষের আইনজীবী আদালতকে জানান, আসামির কাঠগড়ায় থাকা আসামি একা নয়। তার পরিবর্তে অন্য কোনও মহিলা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। বাদী পক্ষের ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তিনদিনের মধ্যে তিনি প্রকৃত আসামি একা কি না, তা যাচাই করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই মহিলার পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে গত ১৮ মে তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে যা জানা যায়
আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “রিমান্ডে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি একা নয়। তার নাম ভাবনা আক্তার।” জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য জানিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম জানান, রিমান্ডে যাওয়া ওই নারী ডিভোর্সি। তিন বছর আগে স্বামীর সঙ্গে তার ডিভোর্স হয়। মা ও পাঁচ বছরের কন্যা সন্তান নিয়ে ওয়ারীর করাতিটোলায় থাকেন তিনি। মামলার তিন নম্বর আসামি একা তার আপন ফুফাতো বোন।
ভাবনা মাঝে মধ্যে সোহেল ফকিরের পল্লবীর ডিওএইচএসের বাসায় আসা যাওয়া করতো। ভাবনাকে তার ফুফু মুন্নি বলেন, একার পরিবর্তে আদালতে আত্মসমর্পণ করে একার রূপ ধারণ করে জামিন নিতে। এ বিষয়ে উকিলকে বলা হয়েছে। এর মূল পরিকল্পনাকারী সোহেল ফকির। সে মতে ভাবনা তার ফুফুর সঙ্গে আদালতে এসে আত্মসমর্পণ করেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর কাছে ভাবনা তার নাম শারমিন আক্তার একা বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু, বিষয়টি আসামি পক্ষের আইনজীবী জানতো না বলে জানা যায়। বিষয়টি জেনে নিজেকে ওই মামলা থেকে প্রত্যাহারের আবেদন করেন।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বলেন, “ভাবনা মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের জন্য কেন আসছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদে সে কোনও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। মামলার আসামিরা বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে অর্থ ও সহায় সম্পত্তি আত্মসাৎ করে আসছে। এই প্রতারক চক্রটি বিশাল বড় ও চতুর। প্রাথমিক তদন্তে আসামি ভাবনা মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।”
মামলায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় ভাবনাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম। আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিপ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আদেশ দেন। এরপর ভাবনার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত ভাবনার জবানবন্দি রেকর্ড করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ভাবনার জবানবন্দি
বিষয়টি নিশ্চিত করে মাহবুবুল আলম বলেন, “জবানবন্দিতে ভাবনা জানিয়েছে, একা তার আপন ফুফাতো বোন। কয়েক মাস আগে একার বাচ্চার জন্ম হয়েছে। তার ফুফু মুন্নি তাকে বুঝিয়ে একা সেজে আদালত আসতে বলে। জানায়, আদালতে গেলেই জামিন হয়ে যাবে। নিজেকে একা পরিচয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর তো একার বিষয়ে জানা গেল।”
মামলার বিবরণ
জানা গেছে, প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে এবং ‘কুফরি-কালাম’ ও ‘শয়তানের নিশ্বাসের’ মাধ্যমে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই মামলাটি দায়ের করা হয়। এতে আরও অভিযোগ করা হয়, ভয়ভীতি দেখিয়ে ১৪ থেকে ১৬ কোটি টাকার জমিও লিখে নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী আজিজুল আলম উত্তরা পূর্ব থানায় শারমিন আক্তার একাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ বিভিন্ন সময়ে শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, নাজমুল হাসান, এ আর রহমান ও আবু ইবনে বিন আব্বাস ওরফে তুষার নামে চার জনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে শিমুল ও নাজমুল জামিন পেয়েছেন।
মামলার এজাহারে আজিজুল আলম অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান নামে এক ব্যক্তি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে জানান, প্রাচীন পিলার বিদেশে বিক্রি করে বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আনা হবে, যার অর্ধেক তিনি পাবেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, সোহেলের ‘সুন্নতি লেবাস’ ও কথাবার্তায় তিনি আস্থা পান। পরে বিভিন্ন ‘কুফরি কালাম’ ও ‘শয়তানের নিশ্বাস’ ব্যবহার করে তাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এরপর টাকা, স্বর্ণালংকার ও জমিজমা হাতিয়ে নেওয়া শুরু হয়। বিভিন্ন সময়ে আজিজুল আলমকে নানা খাবার ও মিষ্টি খাওয়ানো হতো। এরপর থেকে তার স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি কাজ করতো না এবং তিনি তাদের কথামতো চলতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘জিনের মা’ পরিচয়ে এক নারী বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করতেন। পরে নাজমুল, সোহেল ও অন্যরা বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছ থেকে টাকা নিতে থাকেন। একপর্যায়ে ‘জিনের বাদশা’ পরিচয়ে রাসেল নামে একজন ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে ক্ষতির হুমকি দেন।
বাদীর অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রতারণার মাধ্যমে তার কাছ থেকে ২০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরখান এলাকায় তার ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমিও লিখে নেওয়া হয়েছে।



