পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে বৈষম্য ও পদোন্নতি জট: এক বিশ্লেষণ
পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে বৈষম্য ও পদোন্নতি জট

প্রতীকী ছবি

অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশ থাকে সব সময় আলোচনা কিংবা সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। পুলিশকে নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ হলে তার পাঠক বেশি, মোজোতে (মোবাইল জার্নালিজম) খবর হলে তার ভিউ বেশি। আর সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় ট্রাফিক বিভাগে যারা কাজ করেন তাদের নিয়ে। অবশ্য সমালোচনার যৌক্তিক কারণও আছে। সমালোচনা এবং সমালোচনার জবাব সেসব বিষয়ে অন্য কোনো সময় বলা যাবে।

বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে খবর বেড়িয়েছে, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ট্রাফিক পুলিশ, নেই শৌচাগার ও বিশ্রামের সুবিধা। গবেষণায় বলছে ঢাকায় কানে কম শোনেন রিকশাচালক আর ট্রাফিক পুলিশ। এসব ছাড়াও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উল্টো পথে গাড়ি যেতে না দেওয়ায় ট্রাফিক পুলিশকে মারধর কিংবা বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তার। এসব খবর যেন ট্রাফিক পুলিশের নিত্যদিনের সঙ্গী।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জীবনের চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় পুলিশের এই ইউনিটের। মনে হয় একটু এদিক সেদিক হলেও আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে অথবা জীবননাশের শঙ্কা থাকে। এই ট্রাফিক বিভাগে সব থেকে বেশি পদায়ন হয় কিছু ট্রাফিক কনস্টেবল, সার্জেন্ট, টাউন সাব-ইন্সপেক্টর, পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন)।

মহাসড়কে দায়িত্ব পালন সময় নানান ঘটনা ঘটে থাকে। পকেটমার, ছিনতাই, ডাকাত দলের গতিবিধিসহ নানান কিছু। দায়িত্বরত সার্জেন্ট সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ডাকাত দলকে পাকড়াও করে। তারপর ডাকাত দলকে নিয়ে যেতে হয় লোকাল থানায়। কারণ ট্রাফিকের জন্য আলাদা কোনো থানা নেই। ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েও মামলা তদন্ত করতে পারেন না সার্জেন্টরা। আবার লোকাল থানা-পুলিশকে ডাকলেও সময় মতো আসেন না কিংবা তাদের উদাসীনতা দেখা যায় এমন অভিযোগও রয়েছে।

এসব বিষয় নিয়ে পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ট্রাফিক বিভাগে বিশেষ করে সার্জেন্টদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে চাপা ক্ষোভসহ নানা অসন্তোষ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সার্জেন্ট অপু (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমি চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই হাইওয়ে পুলিশে আছি। হাইওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্য দিনের দৃশ্যপট। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে ফার্স্ট রেসপন্ডার হিসেবে আমি যাই, তাৎক্ষণিক রিপোর্ট, জব্দতালিকা তৈরি করি। কেউ মারা গেলে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করি। ঘটনাস্থলে না গিয়েও একজন সাব-ইন্সপেক্টর সেটিতে সাক্ষর করেন। এবং তিনি হন ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।’

সাব-ইন্সপেক্টর বা উপপরিদর্শক পদের কর্মকর্তার ডিউটি না থাকলেও তাকে যুক্ত হতে হচ্ছে এবং সার্জেন্ট পদের কর্মকর্তার, পেশাগত জ্ঞান এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকলেও তিনি ভিকটিম এবং তার পরিবারকে যথাযথ সেবা দিতে পারছেন না। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সেবা পেতে দেরি হচ্ছে আরেক দিকে বাড়ছে মামলার জট। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৫৬ এবং পিআরবি ২৫৮ বিধি অনুযায়ী তদন্তভার অফিসার ইনচার্জকে দেওয়া হয়েছে, তিনি তার অধীনস্থ যেকোনো কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করাতে পারেন তবে সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিম্নে নয়।

সাব-ইন্সপেক্টর এবং সার্জেন্ট যেহেতু একই পদমর্যাদার কর্মকর্তা আর তাছাড়া সার্জেন্টগণ যেহেতু নিরস্ত্র কর্মকর্তা; তাই সার্জেন্টদের মামলার তদন্তের সুযোগ দিলে আইনি সেবা ত্বরান্বিত হবে বলেই বিশ্বাস করি।

তদন্তের মতো সংবেদনশীল এবং জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে সার্জেন্টদের বিরত রেখে একদিকে যেমন জন-ভোগান্তি বাড়ছে আরেকদিকে রাষ্ট্রের মেধার অপচয় হচ্ছে। বাহিনীটি সরাসরি এএসআই (সহকারী উপ-পুলিশ পরিদর্শক) নিয়োগের চিন্তা করছে এবং একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে। এতে করে বাহিনীটির ভেতরেই তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

কনস্টেবলদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কনস্টেবল পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা সমমান হলেও অনেকে যোগদানের পর বিভিন্ন পাসকোর্স করে করে স্নাতক বা স্নাতকোত্তরও শেষ করেন। সরাসরি এএসআই নিয়োগ দিলে, বাহিনীতে চাকরির অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান এবং আইন বিষয়ে জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত হবেন কনস্টেবলরা। আশা করি সরাসরি এএসআই নিয়োগের পাশাপাশি এই পদে কনস্টেবলদের পদোন্নতির বিষয়টি যেন সংকুচিত না হয়, সেটি সরকার নিশ্চিত করবে।

বাংলাদেশ পুলিশের অধস্তন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি জট একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যেখানে কনস্টেবল থেকে সহকারী উপ-পুলিশ পরিদর্শক। আবার উপ-পুলিশ পরিদর্শক কিংবা সার্জেন্ট থেকে পুলিশ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লেগে যাচ্ছে। অনেক সময় ২০ বছর একই র‍্যাংকে চাকরি করা লাগছে যা ওই কর্মকর্তার মাঝে প্রবল মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। পদোন্নতির এই সমস্যা যুগের পর যুগ জিইয়ে রেখে পুলিশ থেকে কীভাবে ভালো সেবা আশা করা যায়। একই সমস্যা আছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঝেও ক্যাডার সার্ভিসের তুলনায় পুলিশের উচ্চতর পদ (যেমন- অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং এসপি) সীমিত হওয়ায় পদোন্নতি স্থবিরতা দেখা দেয়। একই র‍্যাংকে চাকরি করতে হয় দীর্ঘ বছর, একই বিসিএস এ অ্যাডমিন ক্যাডারে যোগদান করে পুলিশ কর্মকর্তার ব্যাচমেটরা তরতর করে পদোন্নতি পেয়ে যান।

জট নিরসনে সরকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত পদোন্নতির পাশাপাশি সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দিলেও এই সুযোগ অধস্তনদের মাঝে নেই। ফলে বাহিনীর নিচের দিকের কর্মকর্তারা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন, বৈষম্যের শিকার হন। অথচ তাঁরাই মাঠপর্যায়ে পুলিশি সেবায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন। সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তাঁদেরই। নানা সুযোগসুবিধা ও ছুটিছাঁটা থেকেও বঞ্চিত হতে হয় তাঁদের। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ হলে একদিকে কমবে বাহিনীর সদস্যদের মনের চাপা ক্ষোভ আরেকদিকে কমবে এই বাহিনীর সদস্যদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা।

আধুনিক সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব আর তার সঙ্গে বাংলাদেশও চলছে সমান তালে। মানুষ এখন আগের চেয়ে যথেষ্ট শিক্ষিত ও সচেতন হয়েছে। এমন বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্মার্ট পুলিশি সেবা দিতে প্রয়োজন আধুনিক, প্রশিক্ষিত, স্মার্ট পুলিশ বাহিনীর। পুলিশের সমস্যা সমাধান করে সরকার এবং জনগণ উভয় জনবান্ধব পুলিশ গঠনে আন্তরিকতা দেখাবে বলেই বিশ্বাস করি।

জুয়েল মামুন
সাবেক শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়