সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ: গুলশানে বিদেশি মডেলের মারধরের ভিডিও ভাইরাল
গুলশানে বিদেশি মডেলের মারধর ভিডিও ভাইরাল, ইনফ্লুয়েন্সারদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন

সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ: গুলশানে বিদেশি মডেলের মারধরের ভিডিও ভাইরাল

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাবক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। সোশ্যাল প্ল্যাটফরমগুলোর কল্যাণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক দর্শকের নিকট পৌঁছাইবার সুবর্ণ সুযোগ লুফিয়া লইতেছে অসংখ্য মানুষ। আর এই ধারাবাহিকতায় 'কনটেন্ট ক্রিয়েটর' নামে এক নতুন পেশাগত ও সামাজিক শ্রেণির উত্থান ঘটিয়াছে এবং যাহাদের অনেকেই সমাজসচেতন বার্তা প্রচার, শিক্ষামূলক তথ্য উপস্থাপন এবং সৃজনশীল বিনোদনের মাধ্যমে জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করিতেছেন।

কনটেন্ট নির্মাণের নব-ট্রেন্ড ও উদ্বেগজনক প্রবণতা

কনটেন্ট নির্মাণের এই নব-ট্রেন্ড বর্তমান যুগে সৃজনশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নিঃসন্দেহে; তবে এই কথাও সত্য যে, ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি ইহার উদ্বেগজনক প্রবণতাও ক্রমশ দৃশ্যমান হইতেছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটররা বিভিন্ন সময় এমন সকল কর্মকাণ্ড করিয়া বসেন, যাহা সমাজে অস্বস্তি, বিরক্তি এবং কখনো কখনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়া থাকে। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও মডেলদের অপেশাদার এবং উদ্ধত আচরণ লইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনই এক তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছে।

গুলশানে বিদেশি মডেলের মারধরের ঘটনা

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াইয়া পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ব্যস্ত সড়কে এক পথচারীকে রাশিয়ান বংশোদ্ভূত মডেল মনিকা কবির নির্দয়ভাবে পিটাইতেছেন। ঘটনা বিবরণে জানা যায়, গুলশানের ট্রাফিক সিগন্যালে রাস্তা পারাপাররত এক পথচারীর কাঁধের ব্যাগ অসাবধানতাবশত মডেল মনিকার কনুইয়ে লাগিলে তিনি প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হইয়া উঠেন। অতঃপর গাড়ি হইতে নামিয়া ঐ ব্যক্তিকে তিনি ধাক্কা দেন এবং নিজের ব্যাগ দিয়া বারবার আঘাত করিতে থাকেন।

মারধরের ভিডিওটি মনিকা নিজেই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে আপলোড করেন এবং তাহা মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হইয়া যায়। ঘটনাটি ইতিমধ্যে নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করিয়াছে এবং অধিকাংশ মানুষ ইহাকে 'বিদেশি নাগরিকদের উদ্ধত আচরণ' হিসাবে দেখিতেছেন। সচেতন মহল বলিতেছেন, কারণ যাহাই হউক না কেন, এইভাবে আইন নিজের হাতে তুলিয়া লওয়া এবং প্রকাশ্য দিবালোকে কাউকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা চরম ধৃষ্টতার শামিল।

বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিসা ও কাজ নিয়ে বিতর্ক

উল্লেখ করিতে হয়, কেবল ব্যক্তিগত আচরণই নহে, বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সারদের বাংলাদেশে কাজ করিবার আইনি প্রক্রিয়াও বিতর্ক ঘনীভূত করিতেছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশের বিভিন্ন বড় ব্র্যান্ডের প্রমোশন এবং বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানে ঘনঘন হাজির হওয়া 'অ্যালেক্স টাকলা' নামে পরিচিত এক আলোচিত বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা এই প্রশ্ন তুলিতেছেন যে, এই সকল বিদেশি নাগরিক কোন ধরনের ভিসায় বাংলাদেশে অবস্থান করিয়া থাকেন? টুরিস্ট ভিসায় আসিয়া বাংলাদেশে নিয়মিত বাণিজ্যিক কাজ বা অর্থ উপার্জন করিয়া তাহারা কি আইনের কোনোরূপ ব্যত্যয় ঘটাইতেছেন? সংশ্লিষ্টরা ইহার খোঁজখবর করিবেন নিশ্চয়ই।

বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিক, সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আতিথেয়তা দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রহিয়াছে; কিন্তু ইহার সুযোগ লইয়া স্থানীয় নাগরিকদের হেনস্তা করা বা দেশের আইনকে তোয়াক্কা না করা কিংবা কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর প্রবণতা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্টের নৈতিক সংকট

২০১৭ সালে জনপ্রিয় ইউটিউবার লোগান পলের জাপানের কুখ্যাত আওকিগাহারা বনে একটি ভিডিও ধারণ করিয়া ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হইবার ঘটনার কথা আমরা জানি। উক্ত বনে আত্মহত্যাজনিত এক মৃতদেহ প্রদর্শন করিয়া তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করিয়াছিলেন, যাহাকে অনেকেই মানবিক সংবেদনশীলতার চরম অবমাননা বলিয়া আখ্যায়িত করেন। পরবর্তী সময়ে ভিডিওটি অপসারণ করা হইলেও ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দেয় যে, অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট কতখানি নৈতিক সংকট সৃষ্টি করিতে পারে।

বিভিন্ন সময় কনটেন্ট নির্মাতারা 'প্র্যাংক ভিডিও' বা 'সামাজিক পরীক্ষা'র নামে সাধারণ মানুষকে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন করিয়া তোলেন। কখনো-বা অনুমতি ব্যতিরেকেই ব্যক্তির চেহারা ধারণ করিয়া প্রচার করা হয়, যাহা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইহার ফলে সমাজে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হইতে পারে।

কনটেন্ট নির্মাণে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রয়োজনীয়তা

ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে প্রকাশিত প্রতিটি কনটেন্ট মূলত বৃহৎ জনসমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করিতে সক্ষম। অতএব, কনটেন্ট নির্মাণের সহিত সামাজিক দায়বদ্ধতা, নৈতিকতা এবং মানবিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি নিবিড়ভাবে জড়িত। এই জন্য জনস্বার্থবিরোধী ও অশোভন কনটেন্টের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ জোরদার করা সময়ের দাবি।

কনটেন্ট নির্মাণের ক্ষেত্রে স্মরণে রাখিতে হইবে যে, সৃজনশীলতার প্রকৃত উদ্দেশ্য হইল, সমাজকে আলোকিত করা— অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা নহে। দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটিলেই কেবল কনটেন্ট নির্মাণ সমাজের জন্য আশীর্বাদ হইয়া উঠিবে।