সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই এখন একটি প্রশ্ন বারবার চোখে পড়ছে—‘কী রাগ করলা?’ ফেসবুকের মিম পেজ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, এমনকি বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রচারণামূলক পোস্টেও জায়গা করে নিয়েছে এই সংলাপ। কেউ অফিসের বসকে নিয়ে মিম বানাচ্ছেন, কেউ শিক্ষকের আচরণের সঙ্গে মিল খুঁজছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত সম্পর্কের খুনসুটি টেনে এনে তৈরি করছেন মিম। কয়েক দিনের ব্যবধানে একটি সংলাপ যেন পরিণত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন ট্রেন্ডে।
ট্রেন্ডের উৎপত্তি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ট্রেন্ডের পেছনে রয়েছে একটি ভাইরাল ভিডিও। সেখানে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কের পাশে বসে এক যুবকের হাত দেখে ভাগ্য গণনা করছেন এক ব্যক্তি। ভিডিওটির মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে গণকের কথা বলার ভঙ্গি। তিনি প্রতিটি কথার ফাঁকে ফাঁকে যুবককে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘কী রাগ করলা?’—আর সেই পুনরাবৃত্তিই নেটিজেনদের কাছে হয়ে ওঠে হাস্যরসের উপাদান।
বার্নাম ইফেক্ট
প্রকৃতপক্ষে মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যৎ জানার কৌতূহল; এই তিনটি বিষয়কে পুঁজি করে যুগে যুগে টিকে আছেন এমন গণকরা। তারা এমন সব কথা বলে, যা প্রায় সবার জীবনেই কোনো না কোনোভাবে মিলে যায়। ‘আপনাকে অনেকে ভুল বোঝে’, ‘আপনি অনেক কষ্ট পেয়েছেন কিন্তু কাউকে বলেন না’, ‘খুব শিগগির বড় পরিবর্তন আসবে’—এই ধরনের বাক্য শুনে মানুষ অবাক হয়, মনে করেন গণক যেন তার মনের ভেতরটা পড়ে ফেলেছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই কৌশলের নাম অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে, ‘বার্নাম ইফেক্ট’।
ভিডিও নির্মাতা
এখানে বলে রাখা ভালো, যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, সেটি মূলত বানানো। ভিডিওতে গণকের ভূমিকায় যাকে দেখা যাচ্ছে, তার নাম ইমান আলী। তিনি সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হাস্যরসাত্মক ভিডিও বানিয়ে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমান আলীর ১ লাখ ৪০ হাজারের মতো ফলোয়ার আছে। তবে মজার বিষয় হাত গণনার ভিডিওতে লেখার আগ পর্যন্ত (সকাল সাড়ে ১১টা) ৪ লাখ ৬৩ হাজারেরও বেশি রি-অ্যাক্ট পড়েছে।
সবার জীবনের গল্প, কিন্তু শোনায় ব্যক্তিগত
ইমান আলীর ভিডিওটি ভালোভাবে দেখলে খেয়াল করবেন, সেখানে যেসব কথা বলা হচ্ছে, তার বেশিরভাগই আপনার জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। এটা মূলত ভণ্ড গণকদের সবচেয়ে পুরোনো কৌশল। এমন কিছু বাক্য বলা, যা অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই সত্য হতে পারে। সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, পরিবারে ভুল বোঝাবুঝি; এসব তো প্রায় সবার জীবনেই আছে। তাই গণকের কথা শুনলে মনে হয়, ‘এই মানুষটা আমাকে বুঝতে পারছে।’
ফরার ইফেক্ট
১৯৪৮ সালে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী বার্টাম ফোরার এক পরীক্ষায় তার শিক্ষার্থীদের সবাইকে একই ধরনের ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ দিয়ে বলেন, এটি নাকি ব্যক্তিগতভাবে তাদের জন্য তৈরি। আশ্চর্যজনকভাবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী সেটিকে ‘অত্যন্ত নির্ভুল’ বলে মনে করেন। পরে এই ঘটনাই ‘ফরার ইফেক্ট’ বা ‘বার্নাম ইফেক্ট’ নামে পরিচিত হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ সাধারণত এমন তথ্যই বেশি মনে রাখে, যা নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। যে কথাগুলো মেলে না, সেগুলো সহজেই ভুলে যায়। ফলে গণকের ‘সফল গণনা’ বড় হয়ে ওঠে, ভুলগুলো হারিয়ে যায়।
ভবিষ্যৎ জানার আকাঙ্ক্ষা
আর ভবিষ্যৎ জানার আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। প্রাচীন মিশর, গ্রিস, ভারত—সব সভ্যতাতেই জ্যোতিষচর্চার অস্তিত্ব ছিল। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান দেখিয়েছে, মানুষের মনকে বুঝে ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ দেখানোর কৌশলও বহু পুরোনো।
ভণ্ড গণকদের কৌশল
এসব ভণ্ড গণকরা কিছু সাধারণ সমস্যা চিহ্নিত করেন—চাকরি হচ্ছে না, বিয়ে আটকে আছে, সংসারে অশান্তি, ব্যবসায় ক্ষতি। তারপর বলেন, ‘আপনার ওপর খারাপ প্রভাব আছে’ বা ‘কেউ ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।’ ভয় তৈরি হওয়ার পর শুরু হয় তাবিজ, রত্নপাথর, কুফরি কালাম বা জ্বিন তাড়ানোর ব্যবসা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি অনেকটা ‘কোল্ড রিডিং’ কৌশলের মতো। কথাবার্তা, পোশাক, বয়স, অভিব্যক্তি দেখে দ্রুত অনুমান করা হয় একজন মানুষ কোন ধরনের সংকটে থাকতে পারেন। তারপর সেই অনুমানকে রহস্যময় ভাষায় উপস্থাপন করা হয়।
কেন জনপ্রিয়তা পেল ‘রাগ করলা?’
শুধু সংলাপ নয়, মানুষকে প্রভাবিত করার তার চাতুর্যপূর্ণ ভঙ্গিও দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, খুব সাধারণ কিছু কথা বলেও ইমান আলী এমনভাবে পরিস্থিতি তৈরি করছেন, যেন যুবকের জীবনের গভীর সত্য জেনে ফেলেছেন। সেই অভিনয়ধর্মী উপস্থাপনাই অনেকের কাছে পরিচিত ও বাস্তব মনে হয়েছে।
এরপর থেকেই শুরু হয় মিমের বন্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা ভিডিওটির বিভিন্ন অংশ কেটে নিজেদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি করতে থাকেন। কেউ লিখছেন, ‘বেতন বাড়ানোর কথা বললে বস—কী রাগ করলা?’ আবার কেউ পরীক্ষার খাতা দেখার সময় শিক্ষকের কল্পিত সংলাপ হিসেবে ব্যবহার করছেন এটি।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পেজও ট্রেন্ডে গা ভাসিয়েছে। অনলাইন শপ থেকে শুরু করে খাবারের দোকান—অনেকে নিজেদের পণ্যের প্রচারণাতেও ব্যবহার করছেন ভাইরাল এই ডায়ালগ। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান সংস্কৃতিতে ট্রেন্ডের সঙ্গে দ্রুত যুক্ত হতে পারলে মানুষের মনোযোগ পাওয়া সহজ হয়।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমন ভাইরাল সংলাপ জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো ‘চেনা অনুভূতি’। মানুষ বাস্তব জীবনে যেসব আচরণ, কথাবার্তা বা চরিত্রের মুখোমুখি হয়, সেগুলোর প্রতিফলন যখন হাস্যরসের মাধ্যমে সামনে আসে, তখন সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ‘কী রাগ করলা?’ সংলাপটিও তেমন এক উদাহরণ, যেখানে একজন রাস্তার গণকের কথা বলার ধরনে মানুষ খুঁজে পেয়েছে নিজের আশপাশের বহু পরিচিত চরিত্রকে।
মনোবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভরসা খোঁজে। চাকরি না পাওয়া, সম্পর্ক ভাঙা, অসুস্থতা, অর্থনৈতিক চাপ—এসব পরিস্থিতিতে কেউ যদি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, তখন সেটি মানসিক স্বস্তি দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন ‘রাশিফল’, ‘ট্যারোট রিডিং’, ‘জন্মতারিখ দেখে ভবিষ্যৎ’ ধরনের ভিডিও লাখ লাখ মানুষ দেখছে। অ্যালগরিদমও মানুষের ভয়, কৌতূহল আর আবেগকে কাজে লাগিয়ে এই কনটেন্ট আরও ছড়িয়ে দেয়।
সতর্কবার্তা
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন এই বিশ্বাস মানুষকে আর্থিক, মানসিক বা সামাজিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। কেউ চিকিৎসার বদলে ‘আধ্যাত্মিক সমাধানের’ পেছনে ছুটতে শুরু করেন, কেউ সম্পর্ক বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ভণ্ড জ্যোতিষীর কথায়।



