রোবোটিক পা ব্যবহারে মস্তিষ্কের অদ্ভুত ধোঁকা: গবেষণায় চাঞ্চল্যকর ফলাফল
রোবোটিক পা ব্যবহারে মস্তিষ্কের ধোঁকা: নতুন গবেষণা

রোবোটিক পা ব্যবহারে মস্তিষ্কের অদ্ভুত ধোঁকা: গবেষণায় চাঞ্চল্যকর ফলাফল

যখন কেউ রোবোটিক পা ব্যবহার করা শেখে, তখন তার মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলে! এটি শুধু কল্পনা নয়, বরং বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত একটি চমকপ্রদ তথ্য। আমাদের মস্তিষ্ক নিজের শরীর সম্পর্কে একটি অদৃশ্য মানচিত্র তৈরি করে, যা হাঁটা বা নড়াচড়ার সময় কাজে লাগে। কিন্তু রোবোটিক পা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই মানচিত্র বাস্তবতার সাথে মিলছে না, ফলে উদ্ভট পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

গবেষণার পটভূমি ও পদ্ধতি

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হেলেন হুয়াং এবং তাঁর দল একটি যুগান্তকারী গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাঁরা দেখতে চেয়েছিলেন, মানুষ যখন কৃত্রিম পা ব্যবহার করে, তখন তাদের বডি ইমেজ বা নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণা কীভাবে পরিবর্তিত হয়। গবেষণার জন্য ৯ জন পুরোপুরি সুস্থ মানুষকে বেছে নেওয়া হয়, যাদের পা কাটা ছিল না। বরং তাদের একটি হাঁটুকে ৯০ ডিগ্রি ভাঁজ করে সেখানে একটি হাই-টেক রোবোটিক পা লাগিয়ে দেওয়া হয়, অনেকটা জলদস্যুদের কাঠের পায়ের গল্পের আধুনিক সংস্করণের মতো।

টানা চার দিন ধরে অংশগ্রহণকারীদের ট্রেডমিলে হাঁটার প্র্যাকটিস করানো হয়, শর্ত ছিল রেলিং ধরা যাবে না এবং দ্রুত গতিতে হাঁটতে হবে। প্রতিদিন প্র্যাকটিস শেষে গবেষকেরা তাদের বিভিন্ন হাঁটার ভঙ্গির কম্পিউটার অ্যানিমেশন বা ভিডিও দেখাতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, ‘বলো তো, আজ তুমি ঠিক কোন ভিডিওটার মতো করে হেঁটেছ?’

চমকপ্রদ ফলাফল: আত্মবিশ্বাসহীনতা থেকে অতি-আত্মবিশ্বাস

গবেষণার শুরুতে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের খুব ছোট করে দেখছিল। তারা ভাবছিল, তারা নিশ্চয়ই খুব বাজেভাবে হাঁটছে, হয়তো খুব নড়বড়ে দেখাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারা যতটা খারাপ ভাবছিল, ততটা খারাপ তারা হাঁটছিল না। অর্থাৎ, শুরুতে তারা আত্মবিশ্বাসী ছিল না।

কিন্তু চার দিন প্র্যাকটিস করার পর পুরো উল্টো ঘটনা ঘটল! তাদের হাঁটার উন্নতি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা নিজেদের অতি-মূল্যায়ন করতে শুরু করল। তারা ভিডিও দেখে বলল, ‘আমি তো একদম স্বাভাবিক মানুষের মতোই স্বচ্ছন্দে হাঁটছি!’ অথচ বাস্তবে তাদের হাঁটা ততটা নিখুঁত ছিল না। মানে, শুরুতে তারা নিজেদের যতটা কাঁচা ভাবছিল, শেষে এসে নিজেদের তার চেয়ে অনেক বেশি পাকা ভাবতে শুরু করল।

মস্তিষ্কের ধোঁকা: কারণ ও সমাধান

অধ্যাপক হেলেন হুয়াং বলছেন, এই অতি-আত্মবিশ্বাস আসলে ভালো লক্ষণ নয়। কারণ, আপনি যদি মনে করেন, আপনি পারফেক্ট হয়ে গেছেন, তখন আর নিজেকে শুধরানোর চেষ্টা করবেন না। গবেষকেরা দেখেছেন, মানুষ যখন রোবোটিক পা লাগিয়ে হাঁটে, তখন তারা পায়ের দিকে খুব একটা নজর দেয় না। তারা খেয়াল করে তাদের শরীরের ওপরের অংশ সোজা আছে কি না। যেহেতু রোবোটিক পা থেকে তারা কোনো অনুভূতি পায় না, তাই তারা মনে করে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হাঁটছে!

এই সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে অধ্যাপক হুয়াং ভিজুয়্যাল ফিডব্যাক দেওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ, রোগীরা যখন রোবোটিক পা দিয়ে হাঁটার প্র্যাকটিস করবেন, তখন যদি আয়না বা ভিডিওর মাধ্যমে তাদের আসল হাঁটাটা দেখানো যায়, তবে তাদের মস্তিষ্কের ভুল ধারণাটা ভেঙে যাবে।

চিকিৎসাশাস্ত্রে নতুন সম্ভাবনা

এই গবেষণাটি শুধু বিজ্ঞানের জগতেই নয়, চিকিৎসাশাস্ত্রেও নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে যারা কৃত্রিম পা ব্যবহার করবেন, তাদের হয়তো এমন স্ক্রিন দেওয়া হবে, যেখানে তারা নিজেদের হাঁটা দেখতে পাবেন। ফলে তারা আর মস্তিষ্কের এই ফাঁদে পড়বেন না। নিজের ভুল শুধরে তারা হয়তো একদিন সত্যিই একদম স্বাভাবিক মানুষের মতো দৌড়াতে পারবেন!

বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন, কীভাবে মানুষকে তার নিজের নড়াচড়া সম্পর্কে আরও নিখুঁত ধারণা দেওয়া যায়। কারণ, নিজের ভুলটা জানা থাকলেই কেবল মানুষ আরও নিখুঁত হতে পারে। এই গবেষণা রোবোটিক্স ও চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা মানবদেহ ও প্রযুক্তির সমন্বয়কে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।