আইনস্টাইন কি সত্যিই কোয়ান্টাম মেকানিকসের শত্রু ছিলেন?
আইনস্টাইন কি কোয়ান্টাম মেকানিকসের শত্রু ছিলেন?

আলবার্ট আইনস্টাইন কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে কটাক্ষ করে একবার বলেছিলেন, 'আগে যদি জানতাম, বিজ্ঞান এভাবে কাজ করে, তাহলে বিজ্ঞানী না হয়ে ফুটপাতের মুচি হতাম!' ১৯৩০-এর দশকে আইনস্টাইন ও নীলস বোরের মধ্যে কোয়ান্টাম মেকানিকস নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছিল, তা বিজ্ঞানের ইতিহাসে কিংবদন্তি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আইনস্টাইন কি সত্যিই কোয়ান্টাম মেকানিকসের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলেন?

অনিশ্চয়তা নীতি ও আইনস্টাইনের আপত্তি

১৯২৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম মেকানিকসের অনিশ্চয়তা নীতি প্রকাশ করেন। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো কণার অবস্থান ও ভরবেগ একই সঙ্গে নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা এখানে অচল। আইনস্টাইন এই অনিশ্চয়তা মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতির নিয়মে কোনো খুঁত নেই; আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণেই আমরা সবকিছু নিশ্চিতভাবে জানতে পারি না।

সলভে সম্মেলন ও বোর-আইনস্টাইন বিতর্ক

১৯২৭ সালে বেলজিয়ামে অনুষ্ঠিত সলভে সম্মেলনে আইনস্টাইন নীলস বোর ও তার দলের ওপর তোপ দাগেন। তিনি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার 'ভুতুড়ে' ব্যাপারগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আইনস্টাইন ফোটন বক্স এক্সপেরিমেন্ট ও ইপিআর প্যারাডক্সের মতো থট এক্সপেরিমেন্ট উপস্থাপন করেন। বোর ও তার দল প্রতিটি যুক্তির জবাব দেন, কিন্তু আইনস্টাইন তা মেনে নেননি। তিনি বিখ্যাত উক্তি করেন, 'ঈশ্বর পাশা খেলেন না।' জবাবে বোর বলেন, 'ঈশ্বর কী করবেন আর কী করবেন না, তা আপনাকে বলে দিতে হবে না।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনস্টাইনের কোয়ান্টাম তত্ত্বে অবদান

অনেকেই ভুলে যান যে আইনস্টাইন নিজেই কোয়ান্টাম তত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৯০৫ সালে ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন, যার জন্য তিনি ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার পান। এই ব্যাখ্যায় তিনি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করেন। ১৯১৪-১৬ সালে রবার্ট অ্যান্ড্রুজ মিলিক্যান পরীক্ষাগারে আইনস্টাইনের তত্ত্ব প্রমাণ করেন। এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে যৌথভাবে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠা করেন, যা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তি শক্তিশালী করে।

ইপিআর প্যারাডক্স ও কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট

১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন, বরিস পডলস্কি ও নাথান রোজেন মিলে ইপিআর প্যারাডক্স প্রকাশ করেন। তারা দেখান, দুটি এনট্যাঙ্গেলড ফোটনের একটি চাঁদে থাকলে, পৃথিবীর ফোটনের স্পিন মেপে চাঁদের ফোটনের স্পিন জানা যায়। এটি অনিশ্চয়তা নীতি ও বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব লঙ্ঘন করে বলে আইনস্টাইন দাবি করেন। যদিও পরে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানীরা এর ব্যাখ্যা দেন, ইপিআর প্যারাডক্স কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্টের ধারণা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আইনস্টাইন কি শত্রু নাকি সমালোচক?

আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিকস নিয়ে গবেষণা থামিয়ে দেননি। তিনি থিওরি অব এভরিথিং নিয়ে কাজ করেছেন, যা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও জেনারেল রিলেটিভিটিকে একত্রিত করবে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ডেভিড কাইজার বলেন, 'আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিকসের শত্রু ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন এই তত্ত্বের সবচেয়ে কড়া এবং সবচেয়ে দরকারী সমালোচক। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করতে চাননি, চেয়েছিলেন এই তত্ত্বকে পূর্ণ করতে।' মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী শন ক্যারল বলেন, 'আইনস্টাইনের প্রশ্নগুলো কতটা গভীর ছিল। তিনি কোয়ান্টাম মেকানিকসের দুর্বলতাগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন। সেগুলোই আজ কোয়ান্টাম ইনফরমেশন এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে।'

সুতরাং, আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিকসের যত বড় সমালোচকই হোন না কেন, তাঁকে কোনোভাবেই শত্রু বলা চলে না। তাঁর সমালোচনা কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে আরও নিখুঁত ও পরিপূর্ণ করতে সহায়তা করেছে।