মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্যের জট খোলার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের এক প্রত্যন্ত গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ থেকে ছুটে আসা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভুতুড়ে কণা বা গোস্ট পার্টিকেলের উৎস শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, শ্যাডো ব্লাস্টার ডাকনামের ওই দূরবর্তী নক্ষত্র গঠনকারী ছায়াপথটি থেকেই উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো পৃথিবীর দিকে ছুটে এসেছিল। এই কণার উৎপত্তিস্থল খুঁজে পাওয়াকে মহাকাশবিজ্ঞানের একটি বিরাট অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিউট্রিনো কী এবং কেন এটি ভুতুড়ে কণা?
নিউট্রিনো মহাবিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। ভুতুড়ে কণা বলার কারণ হলো, এদের কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই, ভর নেই বললেই চলে এবং এরা অন্য কোনো পদার্থের সঙ্গে প্রায় কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সাধারণত সুপারনোভা বা নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, নক্ষত্রের ভেতরের পারমাণবিক বিক্রিয়া ও ভারী কণার ভাঙনের ফলে নিউট্রিনো তৈরি হয়। অ্যান্টার্কটিকার আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির মতো উন্নত পরীক্ষাগারে এই কণাগুলো ধরা পড়লেও তারা ঠিক কোথা থেকে আসছে, তা খুঁজে বের করা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য সব সময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গবেষণার বিস্তারিত
তাইওয়ানভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মিটোস সায়েন্স কোম্পানি লিমিটেডের গবেষক ডক্টর ইউজি উরাতা বলেন, নিউট্রিনো পদার্থের সঙ্গে খুব কমই মিথস্ক্রিয়া করে। এ কারণেই তারা প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই পুরো মহাবিশ্ব ভ্রমণ করতে পারে। আইসকিউব যখন একটি উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করে, তখন আকাশের সেই নির্দিষ্ট অবস্থানটি একটি গ্যালাক্সির আকারের চেয়ে অনেক বেশি বড় ও অস্পষ্ট এলাকাজুড়ে দেখায়।
বিজ্ঞানীরা জানান, উৎস বস্তুটি যদি উজ্জ্বল না হয় বা তার ভেতরে কোনো ধরনের সক্রিয়তার বিস্ফোরণ না ঘটে, তবে নিউট্রিনোর সঠিক উৎস চিহ্নিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৭ জুন নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানী উরাতা ও তাঁর দল এই সৌভাগ্যজনক আবিষ্কারের কথা জানান। পৃথিবীতে উচ্চ শক্তির নিউট্রিনোটি ধরা পড়ার ঠিক পরপরই একটি মহাজাগতিক কাকতালীয় ঘটনায় শ্যাডো ব্লাস্টার ছায়াপথটি হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গবেষকদের বিশ্বাস, ছায়াপথটির এই আকস্মিক সক্রিয়তাই তাদের সঠিক উৎসের সন্ধান দিয়েছে। এটি ভবিষ্যতে ভুতুড়ে কণার উৎস খোঁজার নতুন পথ দেখাবে।
আইসকিউব ডিটেক্টরে নিউট্রিনো শনাক্তকরণ
২০২১ সালে অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে থাকা আইসকিউব ডিটেক্টরে এই উচ্চ শক্তির নিউট্রিনোটি ধরা পড়েছিল। এ ধরনের শক্তিশালী কণা প্রতি দুই থেকে তিন বছরে মাত্র একবার দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা কণাটির নাম দেন আইসি২১০৯২২এ। এটি ইরিডানাস নক্ষত্রমণ্ডলের দিক থেকে আসছিল বলে মনে হওয়া মাত্রই অবজারভেটরি থেকে বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
বিজ্ঞানীরা আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালালেও শুরুতে কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরণ, গামা–রে বার্স্ট, এক্স–রে বা দৃশ্যমান আলোর উৎস খুঁজে পাননি। বিজ্ঞানী উরাতা এ বিষয়ে আরও বলেন, নিউট্রিনো শুধু এইটুকুই নির্দেশ করে যে আকাশের কোথাও একটা শক্তিশালী ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেই উৎস ঠিক কী, সেটি কত দূরে বা কী ধরনের বস্তু থেকে তৈরি হয়েছে, তা সাধারণত নিউট্রিনো একা জানাতে পারে না। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে রেডিও, সাবমিলিমিটার, ইনফ্রারেড, অপটিক্যাল, এক্স–রে ও গামা–রে আলোর সাহায্যে সম্মিলিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
উৎস শনাক্তকরণে টেলিস্কোপের ভূমিকা
সতর্কবার্তা পাওয়ার কয়েক দিন পর বিজ্ঞানীরা হাওয়াইয়ের মাউনা কেয়া পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত ইস্ট এশিয়ান অবজারভেটরির জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল টেলিস্কোপ ও সাবমিলিমিটার অ্যারে ব্যবহার করেন। সেই পর্যবেক্ষণের সময়ই তাঁরা জেসিএমটি০৪০২–০৪২৪ নামের সেই বিশেষ নক্ষত্র গঠনকারী ছায়াপথটি আবিষ্কার করতে সমর্থ হন।



