পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম কঠিন কাজ হলো এমন একটি দৈবচয়ন তৈরি করা, যার পূর্বাভাস দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রথমবারের মতো শতভাগ নিখুঁত দৈবচয়ন বা র্যান্ডমনেস তৈরি করেছেন সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ রেনাতো রেনারের নেতৃত্বাধীন একদল গবেষক। আধুনিক বিশ্বের সাইবার নিরাপত্তাকে নিশ্ছিদ্র করতে এবং হ্যাকারদের পক্ষে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন অনুমান করা অসম্ভব করে তুলতেই কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা যুগান্তকারী এই অর্জনটি করেছেন।
দৈবচয়নের চ্যালেঞ্জ
পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম কঠিন কাজ হলো এমন একটি দৈবচয়ন তৈরি করা, যার পূর্বাভাস দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, কেবল চূড়ান্ত ফলাফল দেখে কোনো কিছু আসলেই সম্পূর্ণ এলোমেলো কি না, তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। লুডু খেলার ছক্কার কথাই ধরুন। ছক্কার গায়ে হয়তো অতিসূক্ষ্ম কোনো খুঁত থাকতে পারে, যা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা আসার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। আবার, টস করার সময় যে মুদ্রা আমরা নিক্ষেপ করি, তা-ও কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের চিরায়ত বলবিদ্যার নিয়ম মেনেই চলে।
আসল চ্যালেঞ্জটা কেবল এলোমেলো মনে হয় এমন সংখ্যা তৈরিতে নয়; বরং গাণিতিক ও ভৌতভাবে এটি প্রমাণ করা যে, মহাবিশ্বের কোনো শক্তির পক্ষেই এই ফলাফল আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। তাত্ত্বিকভাবে মুদ্রার ঘূর্ণন, বাতাসের বেগ এবং হাতের বল যদি নিখুঁতভাবে জানা থাকে, তাহলে ফলাফল আগে থেকেই বলে দেওয়া সম্ভব। এমনকি কম্পিউটারের সফটওয়্যারগুলো যেসব র্যান্ডম নম্বর তৈরি করে, সেগুলোও নির্দিষ্ট কিছু গাণিতিক অ্যালগরিদম বা পূর্বনির্ধারিত নিয়ম মেনে চলে।
কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ব্যবহার
এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে ইটিএইচ জুরিখের গবেষক দলটি। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম অদ্ভুত ঘটনা কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট কাজে লাগিয়ে তাঁরা এই সাফল্য পেয়েছেন। গবেষক দলের প্রধান রেনাতো রেনার বলেন, ‘এর মাধ্যমে শূন্য ০ এবং ১-এর যে সিকোয়েন্স তৈরি হয়েছে, তা এখন সত্যিই শতভাগ নিখুঁতভাবে দৈব। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা এখন বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সাহায্যে তা সার্টিফাই করতে পারি।’
কেন প্রয়োজন এই নিখুঁত দৈবচয়ন?
আধুনিক সাইবার নিরাপত্তার মূল ভিত্তি এই দৈবচয়ন। আপনার পাসওয়ার্ড, ওটিপি কিংবা ডিজিটাল ‘এনক্রিপশন কি’ হ্যাকারদের পক্ষে অনুমান করা কতটা কঠিন হবে, তা নির্ভর করে এই র্যান্ডমনেসের ওপর। কোনো কোড বা নম্বর যদি শতভাগ নিখুঁতভাবে এলোমেলো না হয়, তাহলে হ্যাকারদের জন্য তার প্যাটার্ন ধরে ফেলা সহজ হয়ে যায়। যেমন, ২০২৪ সালের ‘PuTTY’ সফটওয়্যারের ক্রিপ্টোগ্রাফিক ত্রুটি এবং ২০২৫ সালের ‘AMD Zen 5’ প্রসেসরের হার্ডওয়্যার বাগের কারণে বিশ্বজুড়ে সার্ভারগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। এর মূলে ছিল ওই ত্রুটিপূর্ণ র্যান্ডম নম্বর জেনারেশন। অধ্যাপক রেনার জানান, ‘আমাদের হাতের ফোন বা কম্পিউটার সম্পূর্ণ পূর্বনির্ধারিত নিয়ম মেনে চলে। তাই একটি সাধারণ ডিজিটাল ডিভাইসের পক্ষে নিজে থেকে সম্পূর্ণ খাঁটি দৈব মান তৈরি করা আসলে অসম্ভব।’
বেল টেস্ট এবং কোয়ান্টাম জাদু
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গবেষকেরা কোয়ান্টাম মেকানিকসের বিখ্যাত বেল টেস্টের শরণাপন্ন হন। তাঁরা ল্যাবরেটরিতে একজোড়া কোয়ান্টাম বিট তৈরি করেন, যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে এনট্যাঙ্গেলড পাকানো অবস্থায় ছিল। এই কিউবিট দুটিকে পরস্পরের থেকে ৩০ মিটার দূরত্বে আলাদা করে রাখা হয়েছিল এবং এদের তাপমাত্রা নামিয়ে আনা হয়েছিল প্রায় পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি। কোয়ান্টাম জগতে এনট্যাঙ্গেলড কণাগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, এদের একটির অবস্থা জানা গেলে অন্যটি যত দূরেই থাকুক না কেন, তাৎক্ষণিকভাবে তার অবস্থাও নির্ধারিত হয়ে যায়। গবেষকেরা যখন এই কিউবিটগুলোর ওপর পরিমাপ চালালেন, তখন তাদের মধ্যে এত শক্তিশালী সম্পর্ক দেখা গেল, যা কোনো সাধারণ গোপন নিয়ম বা আগে থেকে প্রোগ্রাম করে রাখা আচরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে গবেষক দলটি মাত্র ৯ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০০ কোটিরও বেশিবার এই বেল টেস্ট সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।
ইটিএইচ জুরিখের দলটির মূল কৃতিত্ব এখানেই যে তাঁরা র্যান্ডমনেস অ্যাম্প্লিফিকেশন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তাঁরা শুরুতেই একটি আংশিক পক্ষপাতদুষ্ট র্যান্ডম অবস্থা নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাহায্যে সেটিকে একটি প্রমাণিত নিখুঁত দৈবচয়নে রূপান্তরিত করেন। চিরায়ত কোনো উপায়ে এই দৈবচয়ন বিবর্ধন করা তাত্ত্বিকভাবেই অসম্ভব।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গবেষকেরা বলছেন, বর্তমানে সময় গণনার ক্ষেত্রে পারমাণবিক ঘড়ি বিশ্বজুড়ে যেভাবে মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে, নতুন এই সিস্টেমটিও একদিন নিখুঁত দৈবচয়নের ক্ষেত্রে ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করবে। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের যুগান্তকারী এই গবেষণাপত্রটি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে।



