এআই চ্যাটবট মানুষের পারস্পরিক বন্ধন নষ্ট করছে: মার্কিনদের একজোট প্রতিবাদ
এআই চ্যাটবট মানুষের বন্ধন নষ্ট করছে: মার্কিন প্রতিবাদ

এআই চ্যাটবট মানুষের পারস্পরিক বন্ধন নষ্ট করছে: মার্কিনদের একজোট প্রতিবাদ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নানা বিষয়ে মতভেদ থাকলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অনিয়ন্ত্রিত অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ক্রমশ একজোট হচ্ছেন। সম্প্রতি ভার্জিনিয়ার রিচমন্ড শহরের একটি গির্জায় প্রায় ২০০ জন মার্কিন সমবেত হন, যাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ডাটা সেন্টার হাব হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন রোধ করা।

রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে একতা

ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের এসব মার্কিনদের অনেকেই রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট দলের সমর্থক ছিলেন। কেউ এসেছেন সুদূর খামারবাড়ি থেকে, আবার কেউ শহরের উপকণ্ঠ থেকে। তবে গির্জায় সমবেত হওয়া মার্কিনদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত অগ্রযাত্রাকে রুখে দেওয়া। ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্য সিনেটর দানিকা রোয়েম সমবেত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আপনারা কি করপোরেট লোভের কারণে নিজেদের জীবনযাত্রার মান ও পরিবেশ ধ্বংস হতে দেখে ক্লান্ত নন?" তার এই বক্তব্যে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে সমর্থন জানান।

এআইয়ের নেতিবাচক প্রভাব: পরিবেশ থেকে আধ্যাত্মিকতা

প্রযুক্তি নেতাদের মতে, শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন জরুরি। কিন্তু সাধারণ মার্কিনিরা বিষয়টিকে দেখছেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। তাঁরা এআইকে দায়ী করছেন আকাশচুম্বী বিদ্যুৎ বিল, চাকরি হারানোর ভয় এবং কিশোর-কিশোরীদের চ্যাটবট আসক্তির জন্য। অস্টিনের এক চার্চের যাজক মাইকেল গ্রেস্টন মনে করেন, এআই চ্যাটবট মানুষের আধ্যাত্মিকতা ও পারস্পরিক বন্ধন নষ্ট করছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীরা এখন বন্ধু বা পরিবারের বদলে চ্যাটবটের কাছে নিজেদের মনের কথা বলছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, "সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের একা করে দিয়েছিল, আর এআই সেই একাকিত্বের আগুনে ঘি ঢেলে আমাদের সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।"

ডাটা সেন্টার ও পরিবেশগত উদ্বেগ

মার্কিনরা এখন এআই ডেটা সেন্টারের কারণে পরিবেশ ও সম্পদের অপচয় নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদপ্রার্থী ফ্রান্সেসকা হংয়ের প্রচারণার অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে ডেটা সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ। তিনি জানান, জনগণ চায় উইসকনসিন যেন এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য একটি প্রতিকূল পরিবেশ হয়ে ওঠে। জর্জিয়ার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য আলিশিয়া জনসন লড়ছেন সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলের বোঝা কমাতে। তিনি বলেন, "আমি কোনো বিলিয়নিয়ারের সার্ভার ফার্মের জন্য নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে চাই না।"

বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ

অভিনেত্রী ও নির্মাতা জাস্টিন বেটম্যান হলিউডে এআইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তিনি মনে করেন, এআই কেবল পুরনো জিনিসের পুনরুক্তি করতে পারে, এটি কোনো অসাধারণ কিছু তৈরি করতে পারে না। তিনি এআই ছাড়া নির্মিত সিনেমার জন্য ক্রেডো ২৩ নামে একটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল চালু করেছেন। গুগলের সাবেক গবেষক জন পালোউইচ প্রতিষ্ঠানটির এআই মডেল জেমিনি নিয়ে কাজ করতেন, কিন্তু তিনি এক সময় বুঝতে পারেন, এই প্রযুক্তি মানুষকে তথ্যের মূল উৎস থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি গুগল ছেড়ে দেন এবং বর্তমানে প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কাজ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার মাসকোগি নেশনের দুই কর্মী জর্ডান হারমন এবং ম্যাকেঞ্জি রবার্টস তাদের কৃষি জমিতে বিশাল ডাটা সেন্টার নির্মাণের প্রস্তাব রুখে দিয়েছেন। তারা মনে করেন, এআই-র জন্য প্রয়োজনীয় ডাটা সেন্টার আসলে ঔপনিবেশিক মানসিকতারই এক আধুনিক রূপ। লেখক জো অ্যালেন মনে করেন, এআই হলো মানুষকে বুদ্ধিহীন করে তোলার এক যন্ত্র। তিনি হিউম্যানস ফার্স্ট নামে একটি সংস্থা চালু করেছেন, যা মানুষকে এআইয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানায়। উত্তর ক্যারোলিনার নার্স হানা ড্রামন্ড মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবায় এআই কখনোই মানুষের স্পর্শ ও অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না। তিনি নার্সদের অধিকার রক্ষায় এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিরুদ্ধে চুক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

মার্কিনদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি

সব মিলিয়ে মার্কিনদের মধ্যে এআই নিয়ে ভীতি কাজ করছে। জরিপ অনুযায়ী:

  • ৭২ শতাংশ মার্কিন সন্দেহ করেন যে এআই ভুল তথ্য ছড়ানোর কাজ করছে।
  • ৬৬ শতাংশ মার্কিন মনে করেন, এআই ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট করছে।
  • ৫৮ শতাংশ মার্কিন চাকরি হারানো বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পেছনে এআইকে দায়ী করেন।

সিলিকন ভ্যালি হয়তো কোটি কোটি ডলার খরচ করছে এআইয়ে পক্ষে প্রচারণা চালাতে, কিন্তু আমেরিকার সাধারণ মানুষ এখন সংগঠিত হচ্ছে নিজেদের জন্য। তারা মনে করেন, প্রযুক্তি যদি মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে, তবে সেই অগ্রগতির কোনো মূল্য নেই। এই লড়াই হয়তো এআইকে পুরোপুরি থামাতে পারবে না, কিন্তু এটি নিশ্চিত করবে মানুষের ভবিষ্যৎ যেন কোনো যন্ত্রের হাতে বন্দী না হয়।