গুগলের এআই ওভারভিউতে স্বাস্থ্য তথ্যে সতর্কবার্তার অভাব: ব্যবহারকারীদের ঝুঁকি বাড়ছে
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নির্ভর তথ্য দেখানোর সময় প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা স্পষ্টভাবে প্রদর্শন না করে ব্যবহারকারীদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে গুগল— এমন অভিযোগ উঠেছে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুগলের সার্চ ফলাফলের একদম ওপরে প্রদর্শিত ‘এআই ওভারভিউস’–এ সংবেদনশীল বিষয়, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলেও শুরুতেই কোনও সতর্কবার্তা দেখানো হয় না। অথচ প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করা হয় এবং প্রদত্ত তথ্য যাচাই করতে বলা হয়।
সতর্কবার্তার অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যবহারকারী যখন প্রথমবার এআই–তৈরি স্বাস্থ্যতথ্য দেখেন, তখন কোনও ডিসক্লেইমার বা সতর্কবার্তা থাকে না। কেবল ‘শো মোর’ বাটনে ক্লিক করে অতিরিক্ত তথ্য দেখতে গেলে, সেই অংশের একেবারে নিচে ছোট ও হালকা ফন্টে একটি সতর্কবার্তা দেখা যায়। সেখানে লেখা থাকে: “এই তথ্য কেবল তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। চিকিৎসা পরামর্শ বা রোগ নির্ণয়ের জন্য পেশাদার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। এআই–এর উত্তরে ভুল থাকতে পারে।”
গুগল এ বিষয়ে সরাসরি অস্বীকার করেনি যে, প্রাথমিকভাবে স্বাস্থ্যতথ্য প্রদর্শনের সময় সতর্কবার্তা দেখানো হয় না বা তা নিচের দিকে ছোট ফন্টে থাকে। তবে প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, এআই ওভারভিউ উপযুক্ত ক্ষেত্রে সরাসরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে এবং সংক্ষিপ্তসারেই অনেক সময় চিকিৎসা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক ও এআই গবেষক প্যাট প্যাটারানুটেপর্ন বলেন, শুরুতেই সতর্কবার্তা না থাকা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলও ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে বা ব্যবহারকারীকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে নির্ভুলতার চেয়ে গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে পারে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ব্যবহারকারীরা অনেক সময় উপসর্গ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেন না বা ভুলভাবে প্রশ্ন করেন। ডিসক্লেইমার ব্যবহারকারীর অন্ধ বিশ্বাসে একটি বিরতি তৈরি করে এবং তথ্যকে সমালোচনামূলকভাবে বিবেচনা করতে উৎসাহিত করে।
কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের দায়িত্বশীল এআই–বিষয়ক অধ্যাপক গিনা নেফ বলেন, “এআই ওভারভিউ দ্রুততার জন্য তৈরি, নির্ভুলতার জন্য নয়। আর স্বাস্থ্যতথ্যে ভুল মারাত্মক হতে পারে।”
পূর্ববর্তী ঘটনা ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, এআই ওভারভিউয়ে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্যতথ্যের কারণে মানুষ ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছেন। সে ঘটনার পর গুগল কিছু স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সার্চে এআই ওভারভিউ সরিয়ে নেয়, যদিও সব ক্ষেত্রে নয়। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এআই ইন মেডিসিন অ্যান্ড ইমেজিং কেন্দ্রের গবেষক সোনালি শর্মা বলেন, “সার্চ পেজের একদম ওপরে থাকা এই সারাংশ অনেক সময় ব্যবহারকারীর কাছে পূর্ণাঙ্গ উত্তর বলে মনে হয়। এতে মানুষ আর নিচে স্ক্রল করেন না বা ‘শো মোর’–এ ক্লিক করেন না, যেখানে সতর্কবার্তা থাকতে পারে।”
তার মতে, এআই ওভারভিউ প্রায়ই আংশিক সঠিক ও আংশিক ভুল তথ্য দেয়। বিষয়টি সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান না থাকলে কোন অংশ সঠিক আর কোনটি ভুল, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে—এবং সেখানেই বাস্তব ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যতথ্যের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এআই–নির্ভর সারাংশের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে ব্যবহারকারীদের অবশ্যই পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
