কোয়ান্টাম মেকানিকস কি সত্যিই বোঝা যায় না? মিথ ভাঙছে বিজ্ঞান
কোয়ান্টাম মেকানিকস কি বোঝা যায় না? মিথ ভাঙছে বিজ্ঞান

পদার্থবিদ্যার মহান শিক্ষক হিসেবে খ্যাত মার্কিন বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন, 'কোয়ান্টাম মেকানিকস কেউ বোঝে না।' তাঁর এই কথাটিকে এখন অনেকেই পরম সত্য বলে মনে করেন। আসলেই কি তাই? কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিয়ে যাঁরা দিনের পর দিন কাজ করছেন, তাঁরাও কি এই জগতটাকে বোঝেন না?

কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাফল্য

খুদে কণাদের আচরণ বুঝতে এই তত্ত্বের কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞান, নক্ষত্রের ভেতরের কাণ্ডকারখানা, এমনকি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানও কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছাড়া অচল। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল তত্ত্ব বলা হয় একেই। গত এক শতাব্দীতে শত শত পরীক্ষায় সফলভাবে উতরে গেছে এটি। বোঝাই যদি না যাবে, তাহলে এটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এত কাজ করছেন কীভাবে?

কেন বলা হয় 'কেউ বোঝে না'?

তাহলে সবাই কেন বলেন, কোয়ান্টাম কেউ বোঝে না? এর মূল কারণ হলো অনিশ্চয়তা তত্ত্ব এবং এর পরীক্ষালব্ধ ফলাফলগুলোর ভুতুড়ে আচরণ। এ নিয়ে আমরা আগে আলোচনা করেছি। তাই বলে কি একদমই কেউ বোঝেন না এই তত্ত্ব? কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নীলস বোর বলেছিলেন, 'কোয়ান্টাম জগৎ প্রথমবার দেখে যে ভিমরি খাবে না, সে আসলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বোঝেই না।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফাইনম্যানের প্রকৃত বক্তব্য

কোয়ান্টামের বিভ্রান্তিকর জগৎ নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা আছে, এ কথা ঠিক। কিন্তু কেউ যদি না-ই বোঝেন, বিজ্ঞানীরা তাহলে একে দিয়ে কাজ করিয়ে নেন কীভাবে? কোয়ান্টাম মেকানিকসের অন্যতম প্রবাদপুরুষ ফাইনম্যান নিজেও কি এই জগতের কারবার বুঝতেন না? আসলে ফাইনম্যানের ওই একটি লাইন খুব জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ায় এই ধোঁয়াশা বেশি তৈরি হয়েছে। এই কথার আগে-পরে কি তিনি কিছুই বলেননি? নিশ্চয়ই বলেছিলেন। 'কোয়ান্টাম মেকানিকস কেউ বোঝেন না'—বলার পরপরই তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'প্রকৃতি কীভাবে কাজ করে, আমি বরং আপনাদের সেটাই বলব।' প্রকৃতি কীভাবে কাজ করে, সেটি বুঝতে হলে ক্লাসিক্যাল ফিজিকসের পাশাপাশি কোয়ান্টাম মেকানিকস বোঝাও খুব জরুরি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফাইনম্যানের অবদান

ফাইনম্যান নিজেই কোয়ান্টামের বড় এক ধাঁধা সমাধান করেছিলেন। পাথ ইন্টিগ্রাল সমীকরণের ব্যাখ্যা তাঁরই দেওয়া। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কণারা একই সঙ্গে বহু পথ পাড়ি দিতে পারে। কিন্তু শেষমেশ সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথটাই টিকে থাকে, বাকিগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। এই ছিল কোয়ান্টাম কণাদের বহুপথে চলার বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যারই ফলিত রূপ হলো বিখ্যাত ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম।

ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম, যেখানে আনুভূমিক অক্ষ বরাবর t দ্বারা সময়কে বোঝানো হয়েছে এবং উলম্ব অক্ষ বরাবর s দ্বারা স্থানিক অবস্থানকে বোঝানো হয়েছেছবি: রোমাঁবেহার/সিসি/ উইকিমিডিয়া কমন্স

তিনি হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্বেরও একটি চমৎকার সমাধান করেছিলেন। অনিশ্চয়তা তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসে কণাদের কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের ধারণা। এই ধারণা বলে, শূন্যস্থান একেবারে শূন্য নয়; সেখানেও শক্তি আছে। সেই শক্তিকে বলে জিরো পয়েন্ট এনার্জি। এই শক্তি কীভাবে কাজ করে, তার ব্যাখ্যা আছে ফাইনম্যান ডায়াগ্রামে।

পাথ ইন্টিগ্রাল সমীকরণের ব্যাখ্যা ফাইনম্যানের দেওয়া। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কণারা একই সঙ্গে বহু পথ পাড়ি দিতে পারে। কিন্তু শেষমেশ সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথটাই টিকে থাকে, বাকিগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।

তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, শূন্যস্থানে সব সময় কণা ও প্রতিকণাদের ভাঙাগড়ার খেলা চলে। শূন্যস্থানের ওই শক্তি থেকে প্রতিটা বিন্দুতেই একটি করে কণা ও তার প্রতিকণা তৈরি হয়। এসব কণা আবার সময়ের উল্টো দিকে গিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়। কণা-প্রতিকণার সংঘর্ষে উভয় কণাই ধ্বংস হয়ে যায় এবং শক্তি নির্গত হয়। পরক্ষণেই সেই শক্তি থেকে আবার একজোড়া কণা এবং প্রতিকণা তৈরি হয়। এদের বলা হয় ভার্চুয়াল কণা। এভাবে শূন্যস্থানে প্রতিনিয়ত শক্তি ও কণা-প্রতিকণার জন্ম-মৃত্যু ঘটে। অর্থাৎ, শূন্যস্থান নিছক শূন্য ও নিশ্চল নয়। এর প্রতিটা বিন্দুতেই শক্তির খেলা চলে।

ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম শুধু তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বহুবার পরীক্ষায় প্রমাণিত। আজকের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, এমনকি কোয়ান্টাম কম্পিউটারেও ফাইনম্যানের এই তত্ত্ব কাজে লাগানো হয়। এখন প্রশ্ন হলো, কোয়ান্টাম জগৎটা যদি ফাইনম্যান না-ই বুঝবেন, তাহলে এত জটিল ও সফল তত্ত্বের রূপকার তিনি হলেন কীভাবে?

বোর-আইনস্টাইন বিতর্ক

এবার আসা যাক নীলস বোরের কথায়। সময়টা গত শতাব্দীর তৃতীয় দশক। তরুণ কোয়ান্টাম তত্ত্ববিদেরা একের পর এক অদ্ভুত সব তত্ত্ব হাজির করছেন। কিন্তু সেগুলো হজম করা বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ আসে আইনস্টাইনের কাছ থেকে। কোয়ান্টামের অদ্ভুত নীতিগুলোকে তাঁর কাছে বড্ড অলৌকিক ও বিভ্রম মনে হয়। তাই তিনি তোপ দাগেন নীলস বোরের বিরুদ্ধে, কোপেনহেগেনের কোয়ান্টাম কারিগরদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আইনস্টাইনের প্রতিটি যুক্তির জবাব পাল্টা যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেন বোর এবং বিতর্কে আইনস্টাইনকে হারিয়ে দেন। এতে হতাশ আইনস্টাইন বিরক্ত হয়ে বলেন, 'নিশ্চয়ই ঈশ্বর পাশা খেলেন না!' জবাবে বোর বলেছিলেন, 'ঈশ্বর কী করবেন আর কী করবেন না, সেটা আপনাকে বলে দিতে হবে না।'

পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইন ও নীলস বোরছবি: সংগৃহীত

তাঁদের এই বিতর্ক থেকেই স্পষ্ট, বোর নিজেই কোয়ান্টামের অদ্ভুত জগৎটা স্বচ্ছ আয়নার মতো দেখতে পেতেন। যে আইনস্টাইন কোয়ান্টামের তীব্র বিরোধিতা করতেন, তিনিও নিশ্চয়ই এই জগৎটা বুঝতেন। বেশ ভালোমতোই বুঝতেন। কারণ, অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে দিনের পর দিন এভাবে কাউকে আক্রমণ করা যায় না। আইনস্টাইন কোয়ান্টাম জগৎটা বুঝতেন বলেই, বোরের সঙ্গে সেই তীব্র স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দু-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন। তবে সে বিষয়ে আলাপ সামনের পর্বে করব।

উপসংহার

মোদ্দাকথা হলো, কোয়ান্টাম মেকানিকস অদ্ভুত। এর নীতিগুলো বিজ্ঞানীদেরও বিভ্রান্ত করে। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কেউ বোঝে না—এটি স্রেফ জনপ্রিয় একটি মিথ। লেখক: সাংবাদিক