গটফ্রিড উইলহেম লিবনিজ: আধুনিক ক্যালকুলাস ও বাইনারি গণিতের জনক
লিবনিজ: আধুনিক ক্যালকুলাস ও বাইনারি গণিতের জনক

গটফ্রিড উইলহেম লিবনিজ, সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, যাকে সমাহিত করা হয়েছিল মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের উপস্থিতিতে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটি এবং জার্মানির বার্লিন একাডেমি অব সায়েন্সেসের আজীবন সদস্য হয়েও তার মৃত্যুতে কোনো শোক প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠান দুটি। শেষ জীবন কেটেছিল চরম একাকিত্বে, আইজ্যাক নিউটনের সঙ্গে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে তিক্ত ও অন্তহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। নিউটন দাবি করেছিলেন, তার আইডিয়া চুরি করা হয়েছে। ইতিহাস অবশ্য পরে প্রমাণ করেছে, দুজনের আবিষ্কারই ছিল স্বাধীন। কিন্তু আজ আমরা গণিতে নিউটনের জটিল প্রতীক ব্যবহার করি না, বরং লিবনিজের তৈরি সহজ ও আধুনিক প্রতীকগুলোই ব্যবহার করি।

এনিয়াক: প্রথম দিককার কম্পিউটার

১৯৪৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় খবর প্রকাশিত হয় যে, একটি বিস্ময়কর যন্ত্র তৈরি হয়েছে, যা ইলেকট্রনিক গতি ব্যবহার করে গাণিতিক কাজ করতে পারে। যন্ত্রটির নাম এনিয়াক, যা পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি হয়। এর ওজন ২৫ টনের বেশি, ১৫০ বর্গমিটারের বেশি জায়গা দখল করত এবং এতে ২০ হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব ছিল। যন্ত্রটি চালাতে প্রয়োজন হতো ১ লাখ ৫০ হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ, যেখানে আধুনিক ডেস্কটপ কম্পিউটারে লাগে মাত্র ২০০ ওয়াট।

এনিয়াকে আধুনিক কম্পিউটারের মতো কোনো সংরক্ষিত প্রোগ্রাম বা অপারেটিং সিস্টেম ছিল না। দশমিক পদ্ধতির দশটি অঙ্কের জন্য ১০-পজিশন রিং কাউন্টার ব্যবহার করে সংখ্যা সংরক্ষণ করা হতো। প্রতিটি অঙ্কের জন্য প্রয়োজন হতো ৩৬টি ভ্যাকুয়াম টিউব। কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য সুইচ এবং কেবল হাত দিয়ে পরিবর্তন করতে হতো, যা কয়েক সপ্তাহ সময় নিত। ভ্যাকুয়াম টিউবগুলোর আয়ু সীমিত ছিল, এবং ত্রুটিপূর্ণ টিউব খুঁজে বের করতে প্রোগ্রামারদের বিশাল কাঠামোর ভেতরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হতো।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রানজিস্টরের আবিষ্কার ও ডিজিটাল বিপ্লব

এনিয়াকের প্রথম প্রোগ্রামাররা সবাই ছিলেন নারী—কে ম্যাকনাল্টি, বেটি জেনিংস, বেটি স্নাইডার, মার্লিন মেল্টজার, ফ্র্যান বিলাস এবং রুথ লিচটারম্যান। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের কাজের কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

ভ্যাকুয়াম টিউবের সমস্যার সমাধান আসে ১৯৪৭ সালে, যখন বেল ল্যাবরেটরিজের উইলিয়াম শকলি, জন বারডিন এবং ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন প্রথম ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করেন। ১৯৫৬ সালে তারা পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ট্রানজিস্টর ভ্যাকুয়াম টিউবের চেয়ে ছোট, দ্রুতগতির, বেশি নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী ছিল। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৬০-এর দশকে ট্রানজিস্টর দিয়ে তৈরি দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারের জায়গা দখল করে নেয়।

বাইনারি সংখ্যা ও লিবনিজের অবদান

ট্রানজিস্টর হলো মাইক্রোপ্রসেসরের মূল গাঠনিক উপাদান। একটি সিপিইউতে কোটি কোটি ট্রানজিস্টর থাকে, যা অন বা অফ করা যায়। এই দুটি সম্ভাব্য অবস্থা বুলিয়ান বীজগণিতকে সংজ্ঞায়িত করে, যেখানে চলকের মান সত্য বা মিথ্যা, সাধারণত ১ এবং ০ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। আধুনিক কম্পিউটারের ভাষা শুধু এই দুটি প্রতীক নিয়ে গঠিত—০ ও ১। তথ্যের এই মৌলিক একককে বলা হয় বাইনারি ডিজিট বা বিট। ৮ বিটের একটি সিকোয়েন্সকে বলা হয় এক বাইট। এক হাজার বাইট মিলে হয় এক কিলোবাইট, এবং এভাবেই চলতে থাকে।

বিটের একটি সিকোয়েন্সকে ২-এর ধারাবাহিক ঘাতের স্থানিক মান হিসেবে হিসাব করলে আমরা একটি বাইনারি সংখ্যা পাই। উদাহরণস্বরূপ, ১০০০১০০১ বাইনারি সংখ্যাটি দশমিক সংখ্যায় ২৭ + ২৩ + ২০ = ১৩৭। এক বাইট তথ্য দিয়ে আমরা ২৫৬টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যারেক্টার এনকোড করতে পারি।

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, ১৭০০ শতকের আগেই জার্মান দার্শনিক ও গণিতবিদ লিবনিজ বাইনারি পাটিগণিত নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছিলেন। তিনি শুধু ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের তাত্ত্বিক ভিত্তিই স্থাপন করেননি, বরং এমন যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছিলেন যা জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম।

লিবনিজের জীবন ও শিক্ষা

১৬৪৬ সালের ১ জুলাই জার্মানির লিপজিগ শহরে জন্মগ্রহণ করেন লিবনিজ। তার বাবা ফ্রেডরিখ লিবনিজ ছিলেন লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দর্শনের অধ্যাপক। বাবা মারা যান যখন লিবনিজের বয়স মাত্র ছয় বছর। সাত বছর বয়সে নিকোলাই স্কুলে ভর্তি হন এবং বাবার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে অবাধে প্রবেশের সুযোগ পান। বাবার বই পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজে নিজেই ল্যাটিন ভাষা শিখেছিলেন লিবনিজ। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি ল্যাটিন ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

১৬৬১ সালে, মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি তার বাবার পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৬৬২ সালের ডিসেম্বরে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ১৬৬৩ সালের গ্রীষ্মকালীন সেমিস্টার তিনি জার্মানির জেনায় কাটান, যেখানে গণিতের অধ্যাপক এরহার্ড ওয়েগেলের অধীনে পড়াশোনা করেন। ওয়েগেলের বিশ্বাস ছিল, সংখ্যাই মহাবিশ্বের মৌলিক ধারণা।

ক্যালকুলাসের আবিষ্কার ও নিউটনের সঙ্গে বিরোধ

১৬৭২ সালে কূটনৈতিক মিশনে প্যারিসে গিয়ে লিবনিজের দেখা হয় ডাচ পদার্থবিদ ও গণিতবিদ ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনসের সঙ্গে। হাইগেনস তাকে সমসাময়িক গণিতের কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৬৭৫ সালের ২১ নভেম্বরের একটি পাণ্ডুলিপিতে লিবনিজ প্রথম কোনো ফাংশনের ইন্টিগ্রাল বোঝাতে তার বিখ্যাত নোটেশন ∫f(x)dx ব্যবহার করেন।

নিউটন দাবি করেছিলেন, লিবনিজ তার আইডিয়া চুরি করেছেন। নিউটন ১৬৬৬ সালের দিকেই ফ্লাক্সিয়ন ব্যবহার করে ক্যালকুলাসের সূত্র তৈরি করেছিলেন, কিন্তু ১৬৯৩ সালের আগে তা প্রকাশ করেননি। লিবনিজের তৈরি আধুনিক গাণিতিক নোটেশন আজ ক্যালকুলাসের আদর্শ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অন্যদিকে নিউটনের নোটেশন বাতিল হয়ে যায়।

লিবনিজের শেষ জীবন ও উত্তরাধিকার

লিবনিজের বাকি জীবন হ্যানোভারে কেটেছিল, তবে তিনি ইউরোপজুড়ে প্রচুর ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি গণিত, যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা এবং দর্শন নিয়ে লেখালেখি চালিয়ে যান। তিনি ছিলেন প্রথম বড় ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী, যিনি চীনা সভ্যতার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে খেয়াল করেছিলেন, চীনের প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীর বই আই চিং-এর হেক্সাগ্রামগুলো ০০০০০০ থেকে ১১১১১১ পর্যন্ত বাইনারি সংখ্যার সঙ্গে মিলে যায়।

লিবনিজকে সপ্তদশ শতাব্দীর তিনজন মহান যুক্তিবাদীর একজন ধরা হয়, রেনে দেকার্ত এবং বারুখ স্পিনোজার সঙ্গে। তিনি ইতিহাসের শেষ বহুবিদ্যাবিশারদদের একজন, যিনি প্রায় ২ লাখ পৃষ্ঠার লিখিত পাণ্ডুলিপি রেখে গেছেন।

লিবনিজের জীবনের শেষ বছরগুলো নিউটনের সঙ্গে তিক্ত বিরোধের কারণে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তিনি বিয়ে করেননি এবং ১৭১৬ সালে হ্যানোভারে একাকী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রয়্যাল সোসাইটি এবং বার্লিন একাডেমি অফ সায়েন্সেস কোথাও তাকে স্মরণ করেনি। কিন্তু ১৯৮৫ সালে জার্মান সরকার বিজ্ঞানীদের জন্য লিবনিজ প্রাইজ চালু করে, যা আজ বিশ্বের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক পুরস্কার। তার আবিষ্কৃত শূন্য ও একের কারসাজি আজ প্রতিটি কম্পিউটারের পিক্সেল, বিট এবং ট্রানজিস্টরের স্পন্দনে বিদ্যমান।