রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি প্রবেশ শুরু, ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি প্রবেশ শুরু, ঐতিহাসিক যাত্রা

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে আজ মঙ্গলবার পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানো শুরু হচ্ছে। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা বৈশ্বিক সংকট পেরিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের যাত্রা শুরু হলো। এর মাধ্যমে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ।

জ্বালানি প্রবেশ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া

চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বসানোর পর তা থেকে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পীভূত হয়ে টারবাইন ঘোরাবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর এলাকায় নির্মিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে জ্বালানি প্রবেশ করানো হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এটি চূড়ান্ত ধাপ। ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে এবং আগামী আগস্টে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হতে পারে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকল্পের গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক মূল্য

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। এটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে কম খরচে দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ দেবে রূপপুর। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করবে এই কেন্দ্র, যার অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। ইতিমধ্যে দক্ষ জনবল তৈরি হয়েছে এবং আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।

পারমাণবিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা

পারমাণবিক জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি। ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা তৈরি হয়, যা ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে জ্বালানি রড তৈরি করা হয়। নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেক রড একসঙ্গে যুক্ত করে জ্বালানি বান্ডিল বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি তৈরি হয়। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডিল ব্যবহারের কথা, যার প্রতিটিতে ৩১২টি জ্বালানি রড রয়েছে। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ব্যবহৃত জ্বালানিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকায় তা বিশেষ নিরাপত্তায় রাশিয়ায় নেওয়া হবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে প্রতিটি বান্ডিলের হিসাব রাখা হবে।

বাণিজ্যিক উৎপাদনের সময়সীমা

জ্বালানি প্রবেশ করাতে ৩০ দিন সময় লাগবে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে বিশেষ নজরদারিতে এই কাজ সম্পন্ন হবে। এরপর শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া। পারমাণবিক বিকিরণ ঘটানো ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করতে আরও ৩৪ দিন লাগবে। এরপর ধীরে ধীরে চুল্লিপাত্রের শক্তি উৎপাদনক্ষমতা ৩, ৫, ১০, ২০, ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, যাতে আরও ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। ৩০ শতাংশে পৌঁছালেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্ভব হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শতভাগ বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগবে।

পরিবেশ ও কর্মসংস্থান

কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে দুই কোটি টন এবং গ্যাসনির্ভর কেন্দ্রের তুলনায় ৮০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ কমাবে রূপপুর। এখানে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে; নির্মাণকালে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ কাজ করেছেন।

বিলম্ব ও খরচ

প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে, দ্বিতীয় ইউনিটের ২০২৪ সালের অক্টোবরে। করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কাজ ব্যাহত হয়। অতিরিক্ত চুক্তিতে প্রথম ইউনিটের সময়সীমা ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিটের ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও চুক্তি অনুযায়ী খরচ বাড়েনি, তবে ডলারের দাম বৃদ্ধিতে ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে। মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাড়ে তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ায় বছরে ১০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় সম্ভব হয়নি। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে আরও এক বছর লাগবে।