হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে ইরানের বিটকয়েন পরিকল্পনা
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিটকয়েন টোল পরিকল্পনা

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বৈশ্বিক চাপ উপেক্ষা করেই চলেছে ইরান। এবার এই প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক এক অভিনব পরিকল্পনা উন্মোচন করেছে তেহরান।

নতুন সংস্থা গঠন

সোমবার (১৮ মে) ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা প্রধানরা ‘স্ট্রেট অথরিটি’ বা প্রণালি কর্তৃপক্ষ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, এই কর্তৃপক্ষ এখন থেকে হরমুজ করিডোর দিয়ে নৌযান চলাচল ‘ব্যবস্থাপনা’ করবে। উল্লেখ্য, এই সমুদ্রপথটি দিয়েই বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (পাঁচ ভাগের এক ভাগ) পরিবাহিত হয়।

নতুন এই কর্তৃপক্ষ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে সাগরে থাকা জাহাজগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করবে। তাদের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন থেকে ‘ইরানের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল’ এবং ‘অনুমতি ছাড়া চলাচলকে বেআইনি বা অবৈধ বলে গণ্য করা হবে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্রিপ্টোকারেন্সি বিমা পরিষেবা

এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রণালি পার হওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ‘বিমা’ বা ইন্সুরেন্সের ফি নেওয়া হতে পারে। এই নতুন পরিষেবার নাম দেওয়া হয়েছে ‘হরমুজ সেফ’। ইরানের সরকারপন্থি গণমাধ্যমগুলো সোমবার দাবি করেছে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ইরান ১০ বিলিয়ন (১ হাজার কোটি) ডলারেরও বেশি রাজস্ব বা আয় করতে সক্ষম হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অচল সমুদ্রপথ ও বিকল্পের সন্ধান

দীর্ঘমেয়াদি এই অবরোধ এবং শুল্ক আরোপের কারণে জাহাজ চলাচলের খরচ আরও অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে আরও মারাত্মক করে তুলবে। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সাগরে জাহাজের ওপর ৩৮টি হামলায় ১১ জন নিহত হওয়ার পর থেকে নৌযান পরিচালনাকারীরা এই প্রণালি পার হতে চরম আতঙ্ক বোধ করছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তেল রফতানির জন্য বাধ্য হয়ে বিকল্প রুটের সন্ধান করছে।

তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের টোল আদায়ের যেকোনও ধরনের প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলো। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তি মন্ত্রী এবং অ্যাডনক-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্রুপ প্রধান নির্বাহী ড. সুলতান আল জাবের গত মাসে কোনও ধরনের ‘শর্ত ছাড়াই’ এই সমুদ্রপথটি অবিলম্বে পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

যেভাবে কাজ করবে বিটকয়েন ব্যবস্থা

ইরান জানিয়েছে, এই নতুন ব্যবস্থার বিষয়ে তারা প্রণালির অপর পাড়ে অবস্থিত দেশ ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুসারে, ‘হরমুজ সেফ’ প্ল্যাটফর্মটি আরব উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং কাছাকাছি সমুদ্রপথগুলো দিয়ে চলাচলকারী চালানের জন্য ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিকভাবে যাচাইযোগ্য বিমা নীতি’ অফার করবে। আর এই বিমার মূল্য পরিশোধ করতে হবে বিটকয়েনের মাধ্যমে।

যদিও এই বিমা পরিকল্পনার কোনও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা বিস্তারিত আর্থিক বিবরণ প্রকাশ করেনি তেহরান। ফার্স নিউজের প্রকাশিত কিছু স্ক্রিনশট থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, এই পরিষেবাটি মূলত ইরানি শিপিং কোম্পানি এবং কার্গো মালিকদের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে এই সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটটিতে ইরানের বাইরে থেকে প্রবেশ করা যাচ্ছে না।

নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ইতোমধ্যে ইরানের আর্থিক ব্যবস্থার একটি বড় অংশে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হয়, দেশটির ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই ক্রিপ্টো বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি, যা গত বছর আনুমানিক ৭.৮ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, সাগরে চলাচলকারী নাবিকেরা এখন থেকে একটি নির্দিষ্ট রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে নতুন কর্তৃপক্ষের এই বার্তা শুনতে পাবেন: ‘এটি (আরব উপসাগর) প্রণালি কর্তৃপক্ষ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হতে চাইলে অনুমতি নিন।’ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরও নিশ্চিত করেছে যে, আইআরজিসির নৌবাহিনী সরাসরি এই প্রণালিটি পরিচালনা করছে।

আলোচনায় পাল্টাপাল্টি শর্ত

ইরান আভাস দিয়েছে যে একটি ব্যাপকভিত্তিক শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে তারা এই প্রণালিটি পুনরায় খুলে দিতে প্রস্তুত। তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে তৈরি হওয়া এই অচলাবস্থাকেই বর্তমান শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে গত মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা অবরোধ শুরু করার পর এই জলসীমায় উত্তেজনা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক ইরানি সূত্রের তথ্যমতে, সোমবার ইরানের পক্ষ থেকে একটি নতুন ১৪-দফার প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্থায়ীভাবে যুদ্ধাবসান এবং ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে এই প্রণালিটি আবারও খুলে দেওয়া হতে পারে। তবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো ইরানের এই দাবিগুলো যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শুরুতে আরব উপসাগরে ১ হাজার ৫০০-এরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছিল। তবে ইরান সরকার এবং আইআরজিসি কিছু নির্দিষ্ট জাহাজকে, যার মধ্যে চীনা জাহাজও রয়েছে, ইরানের উপকূলের কাছাকাছি একটি নির্ধারিত রুট দিয়ে পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলো জানিয়েছে, বর্তমান সংঘাতের সমাধান হওয়ার পরই কেবল তাদের সামরিক বাহিনী ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে।

সূত্র: দ্য ন্যাশনাল