স্টারলিংককে আনফিল্টারড ইন্টারনেট রপ্তানির অনুমোদন দিল বাংলাদেশ
স্টারলিংককে আনফিল্টারড ইন্টারনেট রপ্তানির অনুমোদন

বাংলাদেশ ইন্টারনেটের দুনিয়ায় একটি বড় মাইলফলক ছুঁতে যাচ্ছে। এই প্রথমবারের মতো কোনো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে আনফিল্টারড বা ছাঁকনিবিহীন ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির নাম স্টারলিংক। ইলন মাস্কের এই কোম্পানিটি এখন বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইন্টারনেট সরবরাহ করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু আঞ্চলিক ডেটা কানেক্টিভিটির একটি বড় হাব বা কেন্দ্রই হতে যাচ্ছে না, বরং দেশীয় টেলিকম খাতের জন্য বিদেশি মুদ্রা আয়ের এক নতুন দরজাও খুলে যাচ্ছে।

আনফিল্টারড ইন্টারনেট কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

সহজ ভাষায় বললে, আপনি যখন দেশে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তখন সেই ডেটা সরকারের বিভিন্ন ফায়ারওয়াল, ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন বা নজরদারি ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে ফিল্টার হয়ে আপনার কাছে আসে। কিন্তু যখন এই ইন্টারনেট অন্য কোনো স্বাধীন দেশে রপ্তানি করা হবে, তখন সেটি কোনো ধরনের নজরদারি বা বাধা ছাড়াই সরাসরি পাঠানো হয়।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কয়েক মাসের দীর্ঘ আলোচনা, কারিগরি পর্যালোচনা এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্টারলিংকের গ্লোবাল লাইসেন্সিং পরিচালক রেবেকা হান্টারকে ইমেইল করে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের বিষয়টি জানিয়েও দেওয়া হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্টারলিংক কোথা থেকে ব্যান্ডউইথ পাবে?

এখন প্রশ্ন হলো, স্টারলিংক এই বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট পাবে কোথা থেকে? সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, এই ব্যান্ডউইথের প্রধান জোগানদাতা হবে রাষ্ট্রায়ত্ত সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)। স্টারলিংকের সঙ্গে তাদের তিন বছরের একটি ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিজড সার্কিট চুক্তি রয়েছে। তবে কোনো কারণে বিএসসিসিএল প্রয়োজনীয় সক্ষমতা দিতে ব্যর্থ হলে, দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশনস এবং ফাইবার অ্যাট হোমের কাছ থেকেও ব্যান্ডউইথ নিতে পারবে স্টারলিংক।

বিদেশি গ্রাহকদের ডেটা কীভাবে প্রবাহিত হবে?

স্টারলিংক নিশ্চিত করেছে, বিদেশি গ্রাহকদের ডেটা গাজীপুরের কালিয়াকৈর পয়েন্ট থেকে সরাসরি সিঙ্গাপুর বা ওমানের মতো জায়গায় চলে যাবে। বাংলাদেশের কোনো ডেটা এর সঙ্গে যুক্ত হবে না। ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিটিআরসি, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) এবং স্টারলিংকের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কারিগরি বৈঠক হয়। সেখানে স্টারলিংক এই বিষয়টি নিশ্চিত করে। পাশাপাশি দেশের স্থানীয় গ্রাহকদের তথ্যে আইনি নজরদারির জন্য এনটিএমসিকে সরাসরি এপিআই অ্যাক্সেসও দিয়েছে তারা।

স্থানীয় গ্রাহকদের জন্য সীমাবদ্ধতা

অবশ্য এই আনফিল্টারড ইন্টারনেট দেশের ভেতরে থাকা কেউ ব্যবহার করতে পারবেন না। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। এই ডেটা ট্রাফিক শুধু বিদেশি গ্রাহকদের জন্যই বরাদ্দ থাকবে। এমনকি বাংলাদেশে বেড়াতে আসা বিদেশি পর্যটকরাও স্টারলিংকের এই আনফিল্টারড সুবিধা পাবেন না।

স্টারলিংকের স্থানীয় গ্রাহক ও বিদেশি গ্রাহকদের ডেটা যাতে কোনোভাবেই মিলেমিশে না যায়, সে জন্য বিটিআরসি বেশ কড়া শর্ত জুড়ে দিয়েছিল। স্টারলিংককে বাধ্য করা হয়েছে তাদের নেটওয়ার্ক ডায়াগ্রাম জমা দিতে এবং রিয়েল-টাইম ট্রাফিক ফ্লো যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখতে।

বাংলাদেশের টেলিকম খাতে নতুন অধ্যায়

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারতের বিএসএনএলকেও সর্বোচ্চ ২০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করেছিল বাংলাদেশ। তবে স্টারলিংকের মতো একটি বৈশ্বিক স্যাটেলাইট কোম্পানির সঙ্গে এই নতুন চুক্তি বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বাংলাদেশে স্টারলিংকের পথচলা শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল। লাইসেন্স পাওয়ার পর আগস্টে তারা বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে দেশের ভেতরের গ্রাহকদের জন্য তারা দুটি আন্তর্জাতিক গেটওয়ের মাধ্যমে ৮০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করছে। তবে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশে ইন্টারনেট রপ্তানির এই চেষ্টা তারা শুরু করেছিল আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকেই।