বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতি: সংযোগের পরিসংখ্যান নয়, অধিকারের যুগে প্রবেশ জরুরি
বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতি: সংযোগ নয়, অধিকার জরুরি

বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রা: উচ্ছ্বাসের পেছনের কঠিন বাস্তবতা

বাংলাদেশে ডিজিটাল অগ্রযাত্রা নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও, তা কেবল সংযোগের পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজারে, মোবাইল ফোন গ্রাহকসংখ্যা ১৮ কোটি ৫৮ লাখে। এছাড়া, ১ হাজারের বেশি ই-সেবা চালু হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট ডিজিটাল কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে। তবুও, অন্তর্ভুক্তি, প্রবেশগম্যতা, গোপনীয়তা ও জবাবদিহির প্রশ্নগুলো এখনো তীব্রভাবে উপস্থিত।

সংযোগের পরিসংখ্যান বনাম ব্যবহারের বৈষম্য

বাংলাদেশে সাধারণত সংযোগের পরিসংখ্যান দিয়ে অগ্রগতির গল্প বলা হয়, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয় কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ, গ্রাহকসংখ্যা আর ব্যবহার এক বিষয় নয়; ব্যবহার আর ক্ষমতায়নও এক নয়। ১২ কোটির বেশি ইন্টারনেট গ্রাহক থাকা সত্ত্বেও, ব্যক্তি স্তরে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখনো অর্ধেকের নিচে। এর মানে হলো, নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু সমান সক্ষমতার নাগরিক সমাজ তৈরি হয়নি। সংযোগ পৌঁছালেই উন্নয়ন পৌঁছায় না; বরং আয়, লিঙ্গ, শিক্ষা, ভাষা, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নীতিগত সুরক্ষা নির্ধারণ করে কে ডিজিটাল সুবিধা ভোগ করবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা গেছে:

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • ৯৮.৯% পরিবারে অন্তত একটি মোবাইল ফোন আছে।
  • ৭২.৪% পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে।
  • কম্পিউটার আছে মাত্র ৯.১% পরিবারে।
  • শহরে স্মার্টফোনের উপস্থিতি ৮০.৮%, গ্রামে ৬৮.৮%।
  • পুরুষদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার ৫১.২%, নারীদের ক্ষেত্রে ৪৬.৩%।
  • নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানায় পুরুষ ৬৩.২%, নারী ৫২.৮%।

এই সংখ্যাগুলো কেবল প্রযুক্তিগত পরিসংখ্যান নয়; এগুলো সামাজিক ক্ষমতার মানচিত্র প্রকাশ করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিজিটাল অবকাঠামো ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন

প্রযুক্তি সুবিধা দেয় ঠিকই, কিন্তু এটি ক্ষমতাও বণ্টন করে। যে প্ল্যাটফর্ম কথা বলার সুযোগ দেয়, সেটিই নজরদারি করতে পারে; যে অ্যাপ সেবা সহজ করে, সেটিই ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে বিতর্ক কেবল সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যারের নয়, বরং নাগরিক মর্যাদা, স্বাধীনতা, ন্যায়, নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইন্টারনেট ও টেক্সট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নাগরিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং ও দৈনন্দিন সেবা ভয়াবহভাবে ব্যাহত হয়, যা ইন্টারনেটকে জনজীবনের মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ডিজিটাল সেবা ও প্রবেশগম্যতার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে ১ হাজারের বেশি ই-সেবা চালু হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট ডিজিটাল রূপান্তর কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে। এটি বড় অর্জন হলেও, এসব সেবা এখনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পুরোপুরি প্রবেশযোগ্য নয়। একটি সরকারি ওয়েবসাইট যদি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীর জন্য কাজ না করে, বা অনলাইন ফরম সহজ ভাষায় বোধগম্য না হয়, তাহলে ডিজিটাল রূপান্তর ন্যায়সংগত হয় না। প্রবেশগম্যতা কেবল বাড়তি সুবিধা নয়, এটি গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক সূচক বনাম নাগরিক অধিকার

জাতিসংঘের ২০২৪ সালের ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশ ১৯৩ দেশের মধ্যে ১০০তম স্থানে উঠে এসেছে, যা উন্নতি নির্দেশ করে। কিন্তু র্যাঙ্কিং বাড়া আর নাগরিক অধিকার মজবুত হওয়া এক বিষয় নয়। নাগরিকরা হয়তো জানেন না তাদের তথ্য কোথায় জমা হচ্ছে বা ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোথায় আপিল করবেন। ডিজিটাল অগ্রগতি তখনই অর্থবহ, যখন তা নাগরিকের হাতে বেশি স্বচ্ছতা, প্রতিকার ও নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়।

বাংলাদেশে ২০২৫ সালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, যা আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে, নাগরিকরা বাস্তবে তাদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে তা জানতে পারবেন কিনা, বা তথ্য অপব্যবহার হলে প্রতিকার দ্রুত মিলবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ডিজিটাল অধিকারের প্রকৃত পরীক্ষা আদালতের ভাষায় নয়, নাগরিকের অভিজ্ঞতায়।

জেনারেটিভ এআই ও নতুন বৈষম্যের ঝুঁকি

২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় এআই রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক, নৈতিক ও মানবকেন্দ্রিক এআই উন্নয়নের ওপর জোর দেয়। এআই কেবল লেখা বা ছবির যন্ত্র নয়; এটি জ্ঞান সাজায়, সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে এবং সামাজিক পক্ষপাত পুনরুৎপাদন করতে পারে। বাংলা ভাষা, স্থানীয় জ্ঞান ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা যদি এআই নকশায় অন্তর্ভুক্ত না হয়, তাহলে এটি নতুন বৈষম্যের কারখানায় পরিণত হতে পারে।

ডিজিটাল সক্ষমতা ও নাগরিক শিক্ষা

বাংলাদেশে ২০২৫ সালের শেষে ৬ কোটি ৪০ লাখ সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ছিল, যা মোট জনসংখ্যার ৩৬.৩%। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে বড় হলো এর তাৎপর্য: জনপরিসরের বড় অংশ এখন এমন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল, যাদের লক্ষ্য জনস্বার্থ নয়, মনোযোগ ধরে রাখা। ফলে, ডিজিটাল সক্ষমতা কেবল মোবাইল চালানো নয়; এটি প্রযুক্তির শর্ত বোঝা, নিজের উপাত্ত নিয়ে সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া এবং অস্বচ্ছ প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার নাগরিক শক্তি অর্জন। ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন গণতান্ত্রিক নাগরিক শিক্ষার অংশ।

বাংলাদেশের করণীয়: অধিকারভিত্তিক ডিজিটাল নীতি

বাংলাদেশের সামনে করণীয় স্পষ্ট:

  1. ডিজিটাল নীতিকে অধিকার, ন্যায় ও জনস্বার্থের ভাষায় দেখা: শুধু উদ্ভাবন বা বিনিয়োগের ভাষায় নয়, বরং নাগরিক অধিকারকে কেন্দ্রে রাখতে হবে।
  2. প্রবেশগম্যতা ও স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করা: প্রযুক্তি নকশায় বাংলা ভাষা, সহজ ভাষায় সেবা, গোপনীয়তা সুরক্ষা ও অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  3. সহযোগিতামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ: প্রযুক্তি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে শিক্ষক, গবেষক, নারী সংগঠন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ সংযোগের যুগে ঢুকে গেছে, কিন্তু এখনো পুরোপুরি অধিকারের যুগে ঢোকেনি। আমাদের দরকার এমন ডিজিটাল দর্শন, যেখানে নাগরিক শুধু ইউজার নয়, অংশীদার; শুধু উপাত্ত নয়, মানুষ। প্রযুক্তিকে থামানো নয়, বরং মানুষের শর্তে ফিরিয়ে আনা জরুরি, যাতে ডিজিটাল বাংলাদেশ সমানভাবে এগোতে পারে এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ন্যায়সংগত হয়।