হঠাৎ একদিন দেখা গেল, ফেসবুকে আর লগইন করা যাচ্ছে না। পাসওয়ার্ড পরিবর্তন হয়ে গেছে, কিংবা আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে এমন পোস্ট বা বার্তা যাচ্ছে, যা আপনি পাঠাননি। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারলে সেটি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই দেরি না করে পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
কীভাবে নিশ্চিত হবেন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে অনেক সময় ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা ব্যক্তিরাই প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেন। কারণ হ্যাকাররা আক্রান্ত অ্যাকাউন্ট থেকে সন্দেহজনক পোস্ট, বার্তা বা লিংক পাঠাতে পারে। তবে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখেও সহজেই বোঝা যায়, আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে কি না। যেমন:
- নিজের পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করা যাচ্ছে না।
- অজান্তে পাসওয়ার্ড, ই-মেইল বা মোবাইল নম্বর পরিবর্তন হয়ে গেছে।
- নিজের অজান্তেই পোস্ট, মন্তব্য বা মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
- অচেনা ডিভাইস বা স্থান থেকে লগইনের ই-মেইল বা নিরাপত্তা সতর্কবার্তা এসেছে।
- বন্ধুদের কাছ থেকে স্প্যাম বা সন্দেহজনক লিংক পাঠানোর অভিযোগ পাচ্ছেন।
অ্যাকাউন্ট হ্যাক নিশ্চিত হলে দ্রুত করণীয়
অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর দ্রুত ও সতর্কতার সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ করলেই সফলভাবে অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ে।
১. লগইন করা গেলে দ্রুত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন
যদি এখনও ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যায়, তাহলে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন। এ জন্য ফেসবুক অ্যাপে মেনু (=) → সেটিংস অ্যান্ড প্রাইভেসি → সেটিংস → অ্যাকাউন্টস সেন্টার → পাসওয়ার্ড অ্যান্ড সিকিউরিটি → চেঞ্জ পাসওয়ার্ড অপশনে যেতে হবে। নতুন পাসওয়ার্ডটি শক্তিশালী হতে হবে এবং আগে কখনও ব্যবহার করা হয়নি—এমন পাসওয়ার্ড নির্বাচন করা উচিত। একই পাসওয়ার্ড যদি অন্য কোনও ওয়েবসাইট বা অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করা থাকে, সেখানেও তা পরিবর্তন করে নিন।
২. লগইন সম্ভব না হলে রিকভারি প্রক্রিয়া শুরু করুন
হ্যাক হওয়ার পর যদি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা না যায়, তাহলে দ্রুত অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এ জন্য www.facebook.com/hacked-এ গিয়ে 'মাই অ্যাকাউন্ট ইজ কম্প্রোমাইজড' অপশন নির্বাচন করুন। এরপর অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত ই-মেইল, মোবাইল নম্বর বা প্রোফাইলের নাম ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করতে হবে। পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে আগে যে ফোন বা কম্পিউটার দিয়ে নিয়মিত ফেসবুকে লগইন করতেন, সেটিই ব্যবহার করা ভালো।
৩. নিরাপত্তা কোড দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করুন
অ্যাকাউন্ট শনাক্ত হওয়ার পর ফেসবুক আপনার নিবন্ধিত ই-মেইল ঠিকানা বা মোবাইল নম্বরে একটি যাচাইকরণ (ভেরিফিকেশন) কোড পাঠাবে। ওই কোডটি নির্ধারিত স্থানে দিয়ে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। তবে যদি সংশ্লিষ্ট ই-মেইল বা মোবাইল নম্বরে আর প্রবেশাধিকার না থাকে, তাহলে 'নো লংগার হ্যাভ অ্যাক্সেস টু দিস?' অপশন নির্বাচন করে বিকল্প পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় যেতে হবে।
৪. প্রয়োজন হলে পরিচয়পত্র জমা দিন
কোনোভাবেই পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে ফেসবুক অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য সরকারি পরিচয়পত্র জমা দিতে বলতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো বৈধ পরিচয়পত্র আপলোড করতে হতে পারে। পরিচয় যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের জন্য পরবর্তী নির্দেশনা দেবে।
৫. নতুন পাসওয়ার্ড সেট করে আবার লগইন করুন
পরিচয় যাচাই সফল হলে ফেসবুক নতুন পাসওয়ার্ড সেট করার সুযোগ দেবে। নতুন পাসওয়ার্ড নির্ধারণ করার পর ‘কন্টিনিউ’ বা ‘লগইন’ অপশন নির্বাচন করলে আবার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যাবে। এই ধাপের মাধ্যমে মূলত অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিজের কাছে ফিরে আসে। লগইন করার পর অনেক ক্ষেত্রে ফেসবুক একটি সিকিউরিটি চেকআপ চালায়। এতে অ্যাকাউন্টে সাম্প্রতিক সময়ে কী কী পরিবর্তন করা হয়েছে, তা দেখানো হয়। তালিকাটি ভালোভাবে পর্যালোচনা করে কোনো অপরিচিত তথ্য, ই-মেইল, ফোন নম্বর বা সেটিংস যুক্ত হয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।
৬. অ্যাকাউন্ট ফিরে পেলে হ্যাকারকে বের করে দিন
অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার ফিরে পাওয়ার পর প্রথমেই অন্য ডিভাইস থেকে লগইন থাকা সেশনগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। এ জন্য ফেসবুক অ্যাপে মেনু (=) → সেটিংস অ্যান্ড প্রাইভেসি → সেটিংস → অ্যাকাউন্টস সেন্টার → পাসওয়ার্ড অ্যান্ড সিকিউরিটি → ‘হয়ার ইউ আর লগড ইন’ অপশনে যান। এখানে আপনার অ্যাকাউন্টে লগইন থাকা সব ফোন, কম্পিউটার ও ব্রাউজারের তালিকা দেখা যাবে। অপরিচিত কোনো ডিভাইস বা অবস্থান শনাক্ত হলে সেটির পাশে থাকা লগ আউট অপশন নির্বাচন করে সেই সেশন বন্ধ করে দিন।
৭. ই-মেইল, ফোন নম্বর ও পাসওয়ার্ড যাচাই করুন
অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পর প্রথমেই নিশ্চিত করুন, হ্যাকার কোনো নতুন ই-মেইল ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর যুক্ত করেছে কি না। এ জন্য অ্যাকাউন্টস সেন্টার → পার্সোনাল ডিটেইলস → কন্ট্যাক্ট ইনফো অপশনে গিয়ে তথ্যগুলো যাচাই করুন। অপরিচিত কোনো ই-মেইল বা নম্বর থাকলে তা সরিয়ে নিজের তথ্য যুক্ত করুন। এরপর অ্যাকাউন্টস সেন্টার → পাসওয়ার্ড অ্যান্ড সিকিউরিটি → চেঞ্জ পাসওয়ার্ড অপশনে গিয়ে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন বা যাচাই করুন। নিশ্চিত করুন, নতুন পাসওয়ার্ডটি শুধু আপনারই জানা এবং হ্যাকার সেটির কোনোভাবে অ্যাক্সেস করতে পারছে না।
৮. হ্যাকার কী কী পরিবর্তন করেছে, তা যাচাই করুন
অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর প্রোফাইল, মেসেঞ্জার অ্যাক্টিভিটি, সংযুক্ত ফেসবুক পেজ এবং মেটা অ্যাকাউন্টস সেন্টারের তথ্য ভালোভাবে পর্যালোচনা করুন। হ্যাকার যদি কোনো পোস্ট, মন্তব্য, বিজ্ঞাপন বা বন্ধুদের কাছে সন্দেহজনক বার্তা পাঠিয়ে থাকে, সেগুলো মুছে ফেলুন। পাশাপাশি সেটিংস → অ্যাপস এন্ড ওয়েবসাইট অপশনে গিয়ে অচেনা বা সন্দেহজনক কোনো তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ যুক্ত আছে কি না যাচাই করুন। থাকলে সেগুলোর অ্যাক্সেস বাতিল করুন।
৯. সবশেষে চালু করুন দ্বি-ধাপ যাচাইকরণ (2FA)
অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা বাড়াতে দ্বি-ধাপ যাচাইকরণ (টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) চালু করুন। এ জন্য মেনু (=) → সেটিংস অ্যান্ড প্রাইভেসি → সেটিংস → অ্যাকাউন্টস সেন্টার → পাসওয়ার্ড অ্যান্ড সিকিউরিটি → টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন অপশনে গিয়ে এটি সক্রিয় করতে হবে। একই সঙ্গে লগইন অ্যালার্ট চালু রাখুন। এতে ভবিষ্যতে কোনো অপরিচিত ডিভাইস থেকে অ্যাকাউন্টে প্রবেশের চেষ্টা হলে দ্রুত সতর্কবার্তা পাওয়া যাবে।



