ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা, লগইন করা বা অনলাইনে কোনো ফরম পূরণ করা—এসব কাজের মাঝে হঠাৎ করেই সামনে আসে ক্যাপচা। এটি একটি পরীক্ষা, যেখানে কখনো ঝাপসা ছবির মধ্যে মোটরসাইকেল বা ট্রাফিক লাইট শনাক্ত করতে বলা হয়, কখনো আঁকাবাঁকা অক্ষর পড়তে হয়, আবার কখনো শুধু একটি বক্সে ক্লিক করতে বলা হয়, যেখানে লেখা থাকে ‘আমি রোবট নই’। সহজ করে বললে, এটি এমন এক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইট বোঝার চেষ্টা করে যে কাজটি একজন মানুষ করছে, নাকি কোনো স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট করছে।
ক্যাপচার জন্ম ও বিবর্তন
ক্যাপচার ধারণাটি ছিল খুব সহজ: মানুষ যে কাজ সহজে করতে পারে, একই কাজ কম্পিউটারের পক্ষে করা কঠিন—সেই ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষ ও বটকে আলাদা করতে হবে। এর ফলে বট দিয়ে স্প্যাম মন্তব্য করা, ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি, ফাইল ডাউনলোড, অ্যাকাউন্ট দখলসহ নানা ধরনের স্বয়ংক্রিয় অপব্যবহার ঠেকানো সম্ভব হতো।
ইটিএইচ জুরিখের কম্পিউটারবিজ্ঞানী আন্দ্রেয়াস প্লেসনার লাইভ সায়েন্সকে বলেছেন, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ক্যাপচার জন্ম হয়েছিল একটি ‘খুব সহজ, কিন্তু অত্যন্ত কঠিন’ সমস্যা সমাধানের জন্য: ‘আমি যদি কারও সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করি, তাহলে কীভাবে বুঝব যে ওপাশে একজন মানুষ আছে নাকি একটি কম্পিউটার?’ সে সময়ের প্রথম দিকের ক্যাপচাগুলো ছিল বিকৃত বা বাঁকানো অক্ষরের লেখা, কারণ তখনকার টেক্সট-রিডিং সফটওয়্যার এসব বিকৃত লেখা পড়তে পারত না, অথচ মানুষ সহজেই পড়ে ফেলতে পারত।
রিক্যাপচা ও আচরণ বিশ্লেষণ
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে টেক্সট শনাক্ত করার সফটওয়্যারও উন্নত হতে থাকে, ফলে পুরোনো ধরনের ক্যাপচা আর তেমন কার্যকর থাকেনি। তখন আসে নতুন প্রজন্মের ক্যাপচা, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো রিক্যাপচা। এখানে ব্যবহারকারীকে গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের ছবির গ্রিড থেকে ট্রাফিক লাইট, মোটরসাইকেল, সাইকেল কিংবা অন্য কোনো বস্তু শনাক্ত করতে বলা হয়। ২০০৯ সালে গুগল এ সেবা অধিগ্রহণ করার পর এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। টোকিওতে অবস্থিত ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস কম্পিউটিং সেন্টারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের পরিচালক এনজি চং বলেছেন, তখন ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তব জগতের জটিল ও এলোমেলো ছবির মধ্যে বস্তু শনাক্ত করা এখনো মানুষের বিশেষ দক্ষতা।
২০১৪ সালে গুগল চালু করে রিক্যাপচা ভি২, যেখানে শুধু একটি চেকবক্সে ক্লিক করলেই সব সময় কাজ শেষ হতো না। সিস্টেমটি ব্যবহারকারীর মাউস কীভাবে নড়ছে, কত দ্রুত ক্লিক করছে, আগে কীভাবে ওয়েবসাইটে চলাফেরা করেছে—এসব আচরণ বিশ্লেষণ করত। যদি কোনো আচরণ সন্দেহজনক মনে হতো, তাহলে অতিরিক্ত পরীক্ষা হিসেবে ছবির গ্রিড সামনে আসত। কিন্তু এটিও এআই শিখে গেল।
এআইয়ের বিরুদ্ধে ক্যাপচার দুর্বলতা
২০১৬ সালেই গবেষকেরা দেখান, স্বল্প খরচের ডিপ লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে রিক্যাপচা ভি২ সমাধান করা সম্ভব। ২০২৪ সালে আন্দ্রেয়াস প্লেসনার ও তাঁর সহকর্মীরা এমন একটি এআই মডেল তৈরি করেন, যা এ পরীক্ষায় শতভাগ সফল হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে এনজি চং এমন একটি টুল তৈরি করেন, যা মানুষের মতো ব্রাউজিং আচরণ অনুকরণ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি ছবির পরীক্ষা চালু হওয়ার আগেই রিক্যাপচা ভি২ সমাধান করে ফেলে। আর ছবি দেখানো হলেও, এআই কয়েকবারের চেষ্টাতেই সমাধান করতে সক্ষম হয়।
চংয়ের মতে, যখন একটি সাধারণ ল্যাপটপে চলা সহজলভ্য সফটওয়্যারই ক্যাপচার ধাঁধা ও আচরণ বিশ্লেষণ করে ফেলে, দুই স্তরের নিরাপত্তা অতিক্রম করতে পারে, তখন ক্যাপচার মূল ধারণাটি আর আগের মতো কার্যকর থাকে না। কারণ, এর ভিত্তি ছিল এমন কিছু কাজ যা মানুষ পারে, কিন্তু মেশিন পারে না।
তবে কি ক্যাপচার দিন শেষ?
প্লেসনারের মতে, আধুনিক ক্যাপচায় শুধু ধাঁধা সমাধান করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সেটি কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই ক্যাপচা রয়ে গেছে। এআই যতই এগিয়ে যাক, ক্যাপচা এখনো ব্যাপক ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ, এটি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, সহজে কাজে লাগানো যায় এবং দামও কম। গবেষণার সময় প্লেসনারের দলকে এমন একটি ভিপিএন ব্যবহার করতে হয়েছিল, যা প্রতিটি পরীক্ষায় নতুন আইপি ঠিকানা ব্যবহার করত। কারণ, একই আইপি থেকে বারবার ক্যাপচা সমাধান করার চেষ্টা করলে পরীক্ষাগুলো আরও কঠিন হয়ে যেত, এমনকি সেই আইপি ব্লকও হয়ে যেতে পারত।
আধুনিক ক্যাপচা ব্যবস্থা এখন আর শুধু ছবি বা লেখা শনাক্ত করার ওপর নির্ভর করে না। গুগলের রিক্যাপচা ভি৩, ফ্রেন্ডলি ক্যাপচা, এইচক্যাপচা ও ক্লাউডফ্লেয়ার টার্নস্টাইলের মতো সিস্টেম অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীর সামনে কোনো ধাঁধা দেখায় না। এর বদলে এরা বিশ্লেষণ করে: অনুরোধটি কি সত্যিকারের কোনো ডিভাইস থেকে এসেছে? সংশ্লিষ্ট আইপি অ্যাড্রেস কি আগে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে? ব্যবহারকারী কীভাবে ওয়েবসাইটে ব্রাউজ করছেন? তাঁর কুকি হিস্ট্রি কেমন? ব্যবহারে স্বয়ংক্রিয় কার্যকলাপের কোনো লক্ষণ আছে কি না? এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সিস্টেম সম্ভাব্য ক্ষতিকর কার্যকলাপ বা বট শনাক্ত করার চেষ্টা করে।
ক্যাপচার সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা
তবে ক্যাপচার কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। এখন অনেক বটই সহজে ক্যাপচা সমাধান করতে পারে, অথচ মানুষের জন্য ক্যাপচা খুব বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। এ ছাড়া ২০২২ সালের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীদের জন্য ক্যাপচা বৈষম্যমূলক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। ক্যাপচার বাড়তে থাকা জটিলতা নিয়ে প্রযুক্তি পাড়ায় হাসাহাসিও তৈরি হয়েছে। যেমন ডেভেলপার নিল আগরওয়াল বানিয়েছেন ‘I’m Not a Robot’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক গেম, যেখানে খেলোয়াড়দের একের পর এক অদ্ভুত ও ক্রমেই অসম্ভব হয়ে ওঠা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।
ক্যাপচার ভবিষ্যৎ
তাহলে সামনে কী হবে? মেশিন যত বুদ্ধিমান হচ্ছে, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কঠিন ধাঁধা তৈরি করা কোনো সমাধান হতে পারে না। যদি একটি ক্যাপচা সমাধান করতে গণিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাগে, তাহলে সেটি আর কার্যকর থাকে না। ইন্টারনেট এমন হওয়া উচিত, যা সবাই সহজে ব্যবহার করতে পারে। সূত্র: লাইভ সায়েন্স প্লাস।



