২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটেনের শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে এক ভয়াবহ সাইবার হামলা চালানো হয়। হামলার কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ সপ্তাহ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয় এবং পুরো কম্পিউটার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। এই হামলার প্রভাব কেবল কোম্পানিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্রিটিশ অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটি ছিল যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাইবার হামলা, যা দেশের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেয়। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের।
হামলার পেছনে রুশ হ্যাকারদের জড়িত থাকার সন্দেহ
শুরুর দিকে হামলাটি ঘিরে ছিল রহস্য। সাধারণ র্যানসমওয়্যার হামলার মতো কোনো মুক্তিপণ দাবি করা হয়নি। প্রথমে স্ক্যাটার্ড ল্যাপসাস/ডলার হান্টার্স নামের একটি অখ্যাত হ্যাকার গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করে, যাদের মধ্যে ব্রিটেনেরও কয়েকজন হ্যাকার জড়িত ছিল বলে দাবি করা হয়। এতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তারাই হামলার জন্য দায়ী।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে তদন্তে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। তদন্তের সঙ্গে জড়িত পাঁচজন ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার পেছনে ছিল রুশ হ্যাকারদের একটি দল। এই তদন্ত বেশ সংবেদনশীল বলে তাঁরা নিজেদের নাম প্রকাশে অনীহা জানান। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বেসরকারি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করে দেখেছেন, এই হামলার কৌশল ও উদ্দেশ্য স্ক্যাটার্ড ল্যাপসাস/ডলার হান্টার্সের পরিচিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
হামলার কৌশল ও প্রভাব
তদন্তকারীরা এখনো খতিয়ে দেখছেন, হামলাকারীরা সরাসরি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দাপ্তরিক বাসভবন থেকে পাওয়া নির্দেশে কাজ করেছিল, নাকি রুশ সরকারের নীরব সমর্থন পেয়েছিল। ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট সাইবার হামলাটি হওয়ার পর ওই বছরের অক্টোবরে দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, রাশিয়ার সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রুশ হ্যাকারদের হামলা নতুন কিছু নয়। তবে জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের ওপর হামলা চালানোর ঘটনা এবং এতে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, এটি শুধু মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে চালানো হামলা নয়; বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আঘাতের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বহুদিন ধরেই আশঙ্কা ছিল, কোনো বৈরী রাষ্ট্র দূর থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অচল করে অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও প্রতীকী গুরুত্ব
এই হামলার প্রভাব ছিল ব্যাপক। হামলাটির জেরে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্রিটেনের উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যায়। এতে দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের ২০২৬ অর্থবছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৫ কোটি ডলার।
ঘটনাটির প্রতীকী গুরুত্বও ছিল অনেক। রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা জাগুয়ারের গাড়ি ব্যবহার করেন। আর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীও কয়েক দশক ধরে ল্যান্ড রোভার বহরের ওপর নির্ভরশীল।
মাইক্রোসফটের ভূমিকা ও অভিনব র্যানসমওয়্যার
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মাইক্রোসফট আগে থেকেই ওই রুশ হ্যাকার দলকে নজরদারিতে রেখেছিল। হামলার পর তারাই জাগুয়ারকে জানায়, কারা তাদের নেটওয়ার্কে ঢুকেছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় এমন একটি নতুন ধরনের র্যানসমওয়্যার ব্যবহার করা হয়, যার এনক্রিপশন প্রযুক্তি আগে অনেক সাইবার বিশেষজ্ঞই দেখেননি। একজন বিশেষজ্ঞ এটিকে ‘মাইন্ড ব্লোয়িং’ বা অত্যন্ত বিস্ময়কর বলে বর্ণনা করেন।
হামলার সময় জাগুয়ার জরুরি ভিত্তিতে একটি ‘ওয়ার রুম’ গঠন করে। সেখানে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি, ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার, পালো অল্টো নেটওয়ার্কস, গুগলের ম্যান্ডিয়ান্ট ইউনিট এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই একসঙ্গে কাজ করে। তারা যখন সম্মিলিতভাবে হামলা ঠেকানোর চেষ্টায় লিপ্ত ছিল, তখন হ্যাকাররা নিজেদের সব চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করছিল।
রাশিয়া-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক ও সাইবার অপরাধের জাল
এই হামলার সময় রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কও ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। ইউক্রেনকে যুক্তরাজ্য সামরিক সহায়তা দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে রাশিয়া ক্ষুব্ধ ছিল। একই সময়ে সাবেক ব্রিটিশ ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে গোপন সাইবার অভিযান ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ তোলেন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির একজন মুখপাত্র বলেন, “চলমান তদন্ত নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অনেক সাইবার হামলাই রাশিয়া থেকে পরিচালিত অপরাধী গোষ্ঠীগুলো চালিয়েছে এবং এসব গোষ্ঠীর কয়েকটির সঙ্গে রুশ সরকারের সম্পর্ক রয়েছে।”
জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার চলমান তদন্তের কথা উল্লেখ করে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এফবিআইও মন্তব্য করেনি। আর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, “এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।”
হামলার পরিকল্পিততা ও সতর্কসংকেত
তদন্তে দেখা গেছে, হামলাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। পুরোনো সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে ঢোকে। এরপর তারা অত্যাধুনিক র্যানসমওয়্যার ব্যবহার করে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন হামলার কৌশল সাধারণ অর্থলাভে আগ্রহী সাইবার অপরাধীদের চেয়ে রাষ্ট্র–সমর্থিত গোষ্ঠীর মধ্যেই বেশি দেখা যায়। অনেক সময় রাষ্ট্রগুলো সাইবার অপরাধীদের অর্থায়ন করে বা উন্নত হ্যাকিং সরঞ্জামও সরবরাহ করে।
পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্বে সাইবার অপরাধের সবচেয়ে বড় উৎস রাশিয়া। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সাইবার অপরাধীদের সঙ্গে সমন্বয় করে গুপ্তচরবৃত্তি ও হামলা চালিয়ে আসছে।
মার্কিন সরকারের সাবেক সাইবার নিরাপত্তা ঠিকাদার অ্যালেক্স অরলিন্স বলেন, “এই সম্পর্ক অনেকটা ১৯৬০ ও ১৯৭০–এর দশকে নিউইয়র্কের কিছু পুলিশ সদস্য ও সংগঠিত অপরাধচক্রের সম্পর্কের মতো।” তাঁর ভাষায়, রুশ সরকার সাইবার অপরাধীদের জন্য একধরনের ‘ছাদ’ হিসেবে কাজ করে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ও উৎপাদন পুনরুদ্ধার
ব্রিটেনের বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড্যান জারভিস এই হামলার সময় নিরাপত্তামন্ত্রী ছিলেন। তিনি গত এপ্রিলে স্কটল্যান্ডে এক সাইবার সম্মেলনে বলেন, “বৈরী রাষ্ট্রগুলো বুঝে গেছে যে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো সরাসরি আক্রমণ নয়; বরং ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষের ভেতরটা ফাঁপা করে দেওয়া।”
তদন্তে জানা যায়, হামলার আগেই জাগুয়ারের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের ইঙ্গিত ছিল। গত বছরের জুনে ‘রে’ নামে এক জর্ডানীয় হ্যাকার কোম্পানির একটি অভ্যন্তরীণ আইপি ঠিকানাসহ কিছু তথ্য প্রকাশ করে। সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, সে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার বিক্রি করত। তার ওই পোস্ট ছিল স্পষ্ট সতর্কসংকেত। কিন্তু তখন একই নেটওয়ার্কে রুশ হ্যাকাররাও নীরবে অবস্থান করছিল।
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট হামলাটি চালানো হয়, ঠিক যখন নতুন মডেলের গাড়ি বিশ্বজুড়ে ডিলারদের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপের মালিকানাধীন জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার যুক্তরাজ্যে ৩৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে এবং তাদের সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে আরও ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা।
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাগুয়ারকে ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, চীন, ভারত ও স্লোভাকিয়ায় উৎপাদন বন্ধ করতে হয়। ফলে পুরো নেটওয়ার্ক দখল করতে পারেনি হ্যাকাররা। কয়েক সপ্তাহের চেষ্টার পর সাইবার বিশেষজ্ঞরা পুরো নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান। অক্টোবর থেকে জাগুয়ার ধীরে ধীরে উৎপাদন শুরু হয় এবং নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
দায় স্বীকার ও সরকারি সহায়তা
হামলার পর স্ক্যাটার্ড ল্যাপসাস/ডলার হান্টার্স টেলিগ্রাম বার্তায় দায় স্বীকার করলেও তদন্তে তা সত্য প্রমাণিত হয়নি। স্ক্যাটার্ড স্পাইডারের মতো গোষ্ঠীগুলো সাধারণত ফিশিং এবং মুক্তিপণ আদায়ের কৌশল ব্যবহার করে। কিন্তু জাগুয়ারের ঘটনায় ব্যবহৃত পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই মাইক্রোসফট জাগুয়ারকে জানায়, রুশ হ্যাকাররাই এর পেছনে রয়েছে। পরে ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় প্রায় ২০০ কোটি ডলারের একটি ঋণের সরকারি গ্যারান্টি পায় কোম্পানিটি, যাতে তারা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে পারে।
গত এপ্রিলে স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সাইবার সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড্যান জারভিস বলেন, “এই সাইবার হামলায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল বিস্ময়কর।” তাঁর ভাষায়, “যদি এই ক্ষতি কোনো প্রচলিত শারীরিক হামলায় হতো, তাহলে সেটি এমন হতো যেন শত শত মুখোশধারী অপরাধী দেশের বিভিন্ন ডিলারশিপে গিয়ে কাচ ভাঙছে, কম্পিউটার গুঁড়িয়ে দিচ্ছে এবং শোরুম থেকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে।”



