বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশুদের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও। সাইবার বুলিং, অনলাইন শিকারি ও অন্যান্য সাইবার হুমকি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৮-১৬ বছর বয়সী ৭০% শিশু নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যার মধ্যে ৩০% শিশু কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে।
সাইবার বুলিং কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক?
সাইবার বুলিং হলো অনলাইনে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা বারবার ক্ষতিকর বা অপমানজনক আচরণ করা। এটি ইমেল, সামাজিক মাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ বা অনলাইন গেমের মাধ্যমে হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার বুলিং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, যার ফলে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। ‘অভিভাবকদের সচেতনতা ও শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা সাইবার বুলিং প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়,’ বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহমান।
অভিভাবকদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা টিপস
শিশুদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে অভিভাবকদের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, কোন ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করছে তা জানা। তৃতীয়ত, শিশুকে শেখানো যে ব্যক্তিগত তথ্য যেমন ঠিকানা, ফোন নম্বর বা স্কুলের নাম অনলাইনে শেয়ার করা উচিত নয়। এছাড়াও, পিতামাতার উচিত শিশুদের সঙ্গে অনলাইন নিরাপত্তা নিয়মিত আলোচনা করা এবং কোনো সমস্যা হলে তা জানাতে উৎসাহিত করা।
প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও টুলস
অভিভাবকরা প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত কন্টেন্ট ব্লক করে এবং ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করে। গুগল ফ্যামিলি লিংক, নর্টন ফ্যামিলি ও ম্যাকাফি সেফ ফ্যামিলির মতো টুলস জনপ্রিয়। ‘প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিশুদের অনলাইন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তবে এটি শুধুমাত্র একটি হাতিয়ার; আসল কাজ হলো শিশুকে সচেতন করে তোলা,’ মন্তব্য করেন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক মো. আসিফ ইকবাল।
শিশুদের শেখানোর বিষয়
শিশুদের শেখানো উচিত যে তারা অনলাইনে অপরিচিত কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবে না। পাশাপাশি, কোনো কিছু ডাউনলোড করার আগে অভিভাবকের অনুমতি নিতে হবে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবককে জানাতে হবে এবং প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করতে হবে। ‘শিশুদের বোঝানো গুরুত্বপূর্ণ যে অনলাইনে সবকিছু সত্য নয় এবং তারা যেকোনো সমস্যায় অভিভাবকের সাহায্য চাইতে পারে,’ বলেন জাতীয় শিশু অধিকার ফোরামের সভাপতি ফারজানা হক।
সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা
সামাজিক মাধ্যম যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক শিশুদের মধ্যে খুব জনপ্রিয়। অভিভাবকদের উচিত শিশুর অ্যাকাউন্টের গোপনীয়তা সেটিংস পরীক্ষা করা এবং নিশ্চিত করা যে শুধুমাত্র পরিচিত ব্যক্তিরাই তাদের কন্টেন্ট দেখতে পারে। এছাড়াও, শিশুকে বোঝানো উচিত যে তারা অপরিচিতদের বন্ধু অনুরোধ গ্রহণ করবে না এবং অশ্লীল বা আপত্তিকর কন্টেন্ট দেখলে রিপোর্ট করবে।
শেষ কথা
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি শিক্ষাগত ও সামাজিক দায়িত্ব। অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের সবাইকে মিলে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিয়মিত আলোচনা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় টুলস ব্যবহার করে সাইবার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।



