মেটার প্ল্যাটফর্মে নারীদের লক্ষ্য করে স্ক্যাম বিজ্ঞাপন: দারাজের নামে ভুয়া চাকরির ফাঁদ
তথ্য গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের ওপর আর্থিক প্রতারণার নতুন এক ধারা প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কীভাবে নারীদের লক্ষ্য করে স্ক্যাম বিজ্ঞাপন ছড়ানো হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপনে ‘ঘরে বসে আয়’, ‘গৃহিণীদের জন্য উপযুক্ত’ কিংবা ‘রিমোট জব’–এর মতো প্রলোভনমূলক ভাষা ব্যবহার করে নারীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। কেউ সাড়া দিলে বিভিন্ন ফি বাবদ ধাপে ধাপে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়।
ভুক্তভোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা
ঢাকার সাবিনা আক্তার (ছদ্মনাম) এমনই এক প্রতারণার শিকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিজ্ঞাপন দেখে তিনি আবেদন করেছিলেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল এটি গৃহিণীদের জন্য ঘরে বসে করার মতো খুচরা কাজ। শুরুতে অল্প লাভ দেখিয়ে তাঁকে আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। একপর্যায়ে স্বামীর কাছ থেকে ধার করে তিনি মোট ৯৭০ টাকা হারান। টাকার অঙ্ক বড় না হলেও লজ্জা ও দোষারোপের ভয়ে তিনি বিষয়টি কাউকে বলতে পারেননি। পরে স্বামী জানতে পেরে রাগারাগিও করেন। সাবিনার ভাষায়, ‘জিনিসটা লজ্জার না? কীভাবে কাউকে বলি?’
আরেক ভুক্তভোগী জানান, শুরুতেই তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে ৫০০ টাকার বেশি বিনিয়োগ করতে হবে না। প্রথমে গেমের মতো কিছু টাস্ক দেওয়া হয় এবং তিনি একবার ৮০০ টাকা তুলতেও সক্ষম হন। এরপর অ্যাকাউন্ট আপগ্রেড করার কথা বলে আরও ১ হাজার ৪০০ টাকা জমা দিতে বলা হয়। পরে তাঁর ড্যাশবোর্ডে ব্যালান্স বাড়ে, তবে তাঁকে আর টাকা তুলতে দেওয়া হয়নি। বরং বলা হয় আরও বেশি টাস্ক সম্পন্ন করতে হলে আরও বেশি অর্থ জমা দিতে হবে।
দারাজের নামে ভুয়া ব্যবহার
ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব বিজ্ঞাপনে প্রায়ই বাংলাদেশের পরিচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজের নাম ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞাপনগুলোতে দারাজের নামে রিমোট চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাস্তবে এমন কোনো প্রকল্প নেই বলে নিশ্চিত করেছে ই–কমার্স প্রতিষ্ঠানটি। প্রতারণা চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছে বার্নার নামের ফেসবুক পেজ, অস্থায়ী ডোমেইন এবং দারাজের কাছাকাছি নামের ভুয়া ওয়েবসাইট। দারাজ নিশ্চিত করেছে, এগুলো ভুয়া এবং তাদের কোনো অফিশিয়াল ডোমেইন নয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেটার অ্যাড লাইব্রেরিতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র এক দিনেই অন্তত ৪০টি ভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে ‘দারাজ রিমোট ওয়ার্ক’ নামে ৪৩৫টি বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছিল। এর মধ্যে ১৭২টি বিজ্ঞাপনে নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প তুলে ধরা হয়েছিল। পেজগুলোর নামেও একটি নির্দিষ্ট ধারা দেখা যায়, যেমন Darazhr6600 বা Darazbd015, যা সরাসরি দারাজের নামের আদলে তৈরি।
প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডার বৈষম্য
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতারণাকে শুধু অর্থ হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এটি প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক প্রতারণার একটি উদাহরণ। নারী আইনজীবীদের সংগঠন জাস্টিসিয়া ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্কের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নাজিয়া নূরে জারিনের মতে, এটি নারীদের লক্ষ্য করে প্রযুক্তিনির্ভর একধরনের অপরাধ। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কায় অনেক নারী প্রতারণার শিকার হলেও অভিযোগ করতে দ্বিধা করেন। প্রতারকেরা সচেতনভাবেই নারীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নীরবতার সুযোগ নেয়, আর প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন কাঠামো ভুক্তভোগী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে তোলে।
ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট এ এম ফারুকের মতে, মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও আচরণের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। বিজ্ঞাপনের ভাষা, ভিজ্যুয়াল এবং ব্যবহারকারীর পূর্ববর্তী অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম অনুমান করে, কে বিজ্ঞাপনে বেশি সাড়া দিতে পারেন। ফলে ‘ঘরে বসে আয়’ বা ‘গৃহিণীদের জন্য’–এর মতো ভাষা ব্যবহার করলে আগে এ ধরনের কনটেন্টে সাড়া দেওয়া ব্যবহারকারীদের কাছেই বিজ্ঞাপন বেশি পৌঁছাতে পারে।
মেটার নীতিমালা ও বাস্তবতা
মেটার বিজ্ঞাপন মানদণ্ড অনুযায়ী, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত সব বিজ্ঞাপনকে ‘ফ্রড, স্ক্যামস ও ডিসেপটিভ প্র্যাকটিসেস’ নীতিমালা মেনে চলতে হয়। ব্যবহারকারীদের প্রতারিত বা বিভ্রান্ত করতে পারে, এমন সব কনটেন্ট এই নীতিমালার আওতায় অগ্রহণযোগ্য। নীতিমালায় বলা হয়েছে, অস্পষ্ট চাকরির প্রস্তাব, অল্প পরিশ্রমে আয়ের প্রতিশ্রুতি কিংবা চাকরির আগে অগ্রিম অর্থ দাবি করলে তা ‘জব ফ্রড অ্যান্ড স্ক্যামস’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে বাস্তবে স্ক্যাম বিজ্ঞাপন দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে চলতে দেখা যায়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, মেটার অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালে কোম্পানির মোট আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ—প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার—স্ক্যাম ও নিষিদ্ধ পণ্যের বিজ্ঞাপন থেকে এসে পড়তে পারে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যবহারকারীদের সামনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ বিলিয়ন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্ক্যাম বিজ্ঞাপন পরিবেশিত হয়।
সতর্কতা ও প্রতিকার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ঘরে বসে আয়’, ‘গৃহিণীদের জন্য সহজ কাজ’, ‘অল্প সময়েই বেশি টাকা’—এ ধরনের প্রলোভনমূলক বিজ্ঞাপন দেখলে আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।
- কোনো চাকরির প্রস্তাব সত্যি কি না, তা যাচাই না করে আবেদন করা বা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
- প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ বা কাস্টমার কেয়ার থেকে তথ্যটি সত্য কি না নিশ্চিত করে নেওয়া প্রয়োজন।
- চাকরির নামে আগে টাকা জমা দিতে বলা হলে সেটিকে সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বৈধ কোনো প্রতিষ্ঠান সাধারণত কাজ দেওয়ার আগে নিবন্ধন ফি বা ‘অ্যাকাউন্ট অ্যাকটিভেশন’–এর নামে অর্থ দাবি করে না।
- প্রতারণার শিকার হলে লজ্জা বা ভয়ের কারণে বিষয়টি গোপন না রেখে পরিবার, পরিচিতজন বা সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে জানানো এবং ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই পেজ বা বিজ্ঞাপন রিপোর্ট করা উচিত।
এই প্রতিবেদনটি ডিসমিসল্যাবের গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি, যা বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান আর্থিক প্রতারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে।
