আই লাভ ইউ ভাইরাস: প্রেমের ছলনায় বিশ্বজুড়ে সাইবার আতঙ্কের ২৬ বছর
আই লাভ ইউ ভাইরাস: সাইবার আতঙ্কের ২৬ বছর

আই লাভ ইউ ভাইরাস: প্রেমের ছলনায় বিশ্বজুড়ে সাইবার আতঙ্কের স্মৃতি

২০০০ সালের মে মাসে বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের ইনবক্সে হঠাৎ করেই একটি ই-মেইল দেখা দিতে শুরু করে। ই-মেইলের বিষয়বস্তু ছিল আই লাভ ইউ (ILOVEYOU) লেখা, যা দেখে কৌতূহলবশত অনেকেই তা খুলে ফেলেন। বার্তায় লেখা ছিল, দয়া করে আমার পাঠানো এই প্রেমপত্রটি চেক করুন, সঙ্গে সংযুক্ত ফাইল হিসেবে ছিল LOVE-LETTER-FOR-YOU.TXT নামের একটি ফাইল।

২৪ ঘণ্টায় বিশ্বজুড়ে ধ্বংসলীলা

এই প্রেমপত্রের ছলনায় হাজার হাজার মানুষ মুহূর্তেই বিষাদের শিকারে পরিণত হন। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আই লাভ ইউ নামের কম্পিউটার ওয়ার্ম বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ কম্পিউটারে সংক্রমিত হয়ে পড়ে। সে সময় ইন্টারনেট সংযোগ থাকা বিশ্বের মোট কম্পিউটারের প্রায় ১০ শতাংশই এই লাভ বাগ বা আই লাভ ইউ ভাইরাসের কবলে পড়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেটওয়ার্ক আর্কিট্যাক্ট হোসে ডোমিঙ্গুয়েজ ২০০০ সালের ৪ মে রাত ৩টা ১৭ মিনিটে প্রথম এই ই-মেইল পান। তিনি লক্ষ করেন মেইলটি এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক পরিচিত ভেন্ডরের কাছ থেকে, যিনি নিজেই এই ভাইরাসের শিকার হয়েছিলেন।

ওয়ার্মের ধ্বংসাত্মক কর্মপদ্ধতি

এই ওয়ার্মটির বিশেষত্ব ছিল তার কর্মপদ্ধতি। কেউ যখন সেই ফাইল ওপেন করত, ওয়ার্মটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীর কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল মুছে ফেলত এবং ব্যবহারকারীর ই-মেইল ঠিকানার তালিকা বা কন্ট্যাক্ট লিস্টে থাকা সবার কাছে নিজেকে পাঠিয়ে দিত।

  • ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, মার্কিন কংগ্রেস ও মার্কিন বিমান বাহিনীর কম্পিউটার তখন আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি।
  • এতে বিশ্বজুড়ে কয়েক শ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা সাইবার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।

প্রযুক্তিবিদ ডোমিঙ্গুয়েজ জানান, তিনি নিজে এই ভাইরাসের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন কারণ তিনি উইন্ডোজের বদলে লিনাক্স সিস্টেম ব্যবহার করতেন। এই ওয়ার্মটি মূলত উইন্ডোজের একটি বিশেষ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছিল।

ফাইল এক্সটেনশনের ছলনা

সে সময় উইন্ডোজ সিস্টেমে ফাইলের এক্সটেনশন (যেমন .exe বা .vbs) লুকিয়ে রাখার অপশন ছিল। হ্যাকাররা ফাইলটি করেছিল .TXT.vbs ঘরানায়। ব্যবহারকারীরা কেবল .TXT অংশটি দেখে মনে করতেন এটি একটি সাধারণ টেক্সট ফাইল, কিন্তু আসলে সেটি ছিল একটি ভিজ্যুয়াল বেসিক স্ক্রিপ্ট, যা ওপেন করার সঙ্গে সঙ্গেই কম্পিউটারে ম্যালওয়্যার কোড চলত।

স্রষ্টার স্বীকারোক্তি

সেই ভয়াবহ ভাইরাসের স্রষ্টা ছিলেন ফিলিপাইনের এএমএ কম্পিউটার কলেজের ২৪ বছর বয়সী ছাত্র ওনেল ডি গুজমান। ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, কেবল বিনা মূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য পাসওয়ার্ড চুরির উদ্দেশ্যে তিনি এটি তৈরি করেছিলেন। বিশ্বজুড়ে এত বড় ধ্বংসলীলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা তাঁর ছিল না।

এর আগে ১৯৯৯ সালে মেলিসা নামে একটি ভাইরাস ছড়ালেও আই লাভ ইউর ব্যাপকতা ছিল অভাবনীয়। আই লাভ ইউ ভাইরাসের আক্রমণ ছিল ইতিহাসের অন্যতম বড় ফিশিং আক্রমণ হিসেবে রেকর্ড গড়ে।

বর্তমান সাইবার নিরাপত্তার শিক্ষা

আজ প্রায় ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও ই-মেইল এখনো সাইবার অপরাধীদের প্রধান মাধ্যম হিসেবে রয়ে গেছে। কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হানান হিবশি বলেন, আই লাভ ইউ আমাদের শিখিয়েছিল ইন্টারনেটের কোনো কিছুকেই চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

  1. বর্তমানে আমাদের সিস্টেমে স্প্যাম ফিল্টার ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি রয়েছে যা সন্দেহজনক ই-মেইলকে আটকে দেয়।
  2. কিন্তু হ্যাকাররা এখন আরও উন্নত উপায়ে আক্রমণ চালাচ্ছে, তাই সতর্কতা জরুরি।

এ কারণে কোনো ই-মেইলের লিংকে ক্লিক করার আগে মাউসের কার্সরটি তার ওপর ধরে আসল ইউআরএল দেখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। আই লাভ ইউ ভাইরাসের ঘটনা আজও সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা ডিজিটাল বিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।