চাঁদপুরে বোনের সম্ভ্রম রক্ষায় ভাইয়ের গুলি: ভুয়া খবরের সত্যতা যাচাই
চাঁদপুরে বোনের সম্ভ্রম রক্ষায় ভাইয়ের গুলি: ভুয়া খবর

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে, চাঁদপুরের মতলব থানার রইচাপুর ইউনিয়নে ১১ বছরের এক শিশু তার বোনের ধর্ষণকারীকে বাবার লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। তবে প্রথম আলোর ফ্যাক্ট চেকে দেখা গেছে, এই ঘটনার কোনো সত্যতা নেই। এটি একটি ভুয়া খবর, যা যাচাই ছাড়াই ছড়িয়ে পড়েছে।

ভাইরাল ভিডিও ও পোস্টের বিবরণ

গত ১৭ এপ্রিল ‘চ্যানেল ইউরোপ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে একটি ভিডিও প্রতিবেদন পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা, ‘চাঁদপুরে বোনের সম্ভ্রম রক্ষায় ১১ বছরের ভাইয়ের চরম পথ।’ পেজটির ফলোয়ার ১৯ লাখ। শনিবার প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত ভিডিওটি ৭৭ লাখবার দেখা হয়, প্রতিক্রিয়া পড়ে প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার, মন্তব্য হয় প্রায় ৩৫ হাজার এবং শেয়ার হয় ৭৫ হাজারের বেশি। ভিডিওটিতে কিছু প্রতীকী ছবি, রেলস্টেশন, কৌতূহলী মানুষের জটলা ও অস্ত্রচালনা চর্চার ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে।

একই দিন ‘শিক্ষা বার্তা’ নামের আরেকটি পেজ থেকেও একই ক্যাপশনে পোস্ট দেওয়া হয়। পেজটির ফলোয়ার ১০ লাখ। পোস্টটিতে প্রায় ২০ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়ে। একই ছবি ও ক্যাপশন ব্যবহার করে ‘বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ড’ নামের একটি পাবলিক গ্রুপও পোস্ট দেয়, যাতে প্রতিক্রিয়া পড়ে প্রায় ১৫ হাজার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মিথ্যা প্রমাণিত দাবি

প্রথম আলোর চাঁদপুর প্রতিনিধি আলম পলাশ জানান, গত প্রায় এক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন খবর ভাইরাল হলেও এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। মতলবে ‘রইচাপুর’ নামে কোনো ইউনিয়ন নেই। চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, তিনি খোঁজ নিয়ে চাঁদপুরের কোথাও এমন কোনো ঘটনা ঘটার তথ্য পাননি। এটি ‘ফেক নিউজ’।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছবি ও ভিডিওর প্রকৃত উৎস

ভাইরাল পোস্টে ব্যবহৃত জনতার জটলার ছবিটি আসলে ২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট ‘শিলন আহমেদ ব্লগ’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে পোস্ট করা ভিডিও থেকে নেওয়া। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল—‘তিন পায়ে হাঁটা দেখলে আপনিও অবাক হয়ে যাবেন, ইকো পার্ক, গাংনী, মেহেরপুর।’ অর্থাৎ দুই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।

হাতকড়া পরা শিশুটির ছবি যাচাইয়ে আরিফুল ইসলাম নামের একজনের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যার ক্যাপশনে লেখা—‘মায়ের মামলায় ছেলে কারাগারে।’ এই ভিডিওর শিশুটির সঙ্গে কথিত ধর্ষণকারীকে গুলিবর্ষণকারী শিশুটির হুবহু মিল। ভিডিওর মন্তব্যের ঘরে তথ্য পাওয়া যায়, ঘটনাটি ঢাকার খিলগাঁও এলাকায়। ছেলে মাদকাসক্ত হওয়ায় মা মামলা করলে শিশুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও

লিটন টেক বিডি ওয়ান নামের ফেসবুক পেজে হাতকড়া পড়া ছেলের ছবি পেছনে রেখে এআই দিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করে পোস্ট দেওয়া হয়। দাবি করা হয়, ‘চাঁদপুরে বোনের ধর্ষণকারীকে বাবার লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে ১১ বছর বয়সি এই ছেলে।’ ভিডিওটি ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি বার দেখা হয়। পেজটির পরিচালক লিটন আলী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনা দেখে কনটেন্ট তৈরি করেন। পরে তিনি ভিডিওটি সরিয়ে ফেলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

রিউমর স্ক্যানারের সিনিয়র ফ্যাক্টচেকার তানভীর মাহতাব আবীর বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগপ্রবণ বা সহিংস ঘটনার গল্প খুব দ্রুত ভাইরাল হয়, কারণ অনেকে তথ্য যাচাইয়ের চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেন। যাচাই না করেই ভাইরাল পোস্টকে ‘রেফারেন্স’ হিসেবে ধরে অনেকে কনটেন্ট বানিয়ে ফেলেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদ আল-জামান বলেন, যাচাই ছাড়াই কনটেন্ট নির্মাণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার মাত্রা তীব্রতর হচ্ছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর উৎসাহের কারণে। প্ল্যাটফর্মগুলো কনটেন্টের সত্যতার চেয়ে জনপ্রিয়তার দিকে বেশি নজর দেয়। চটুল বা স্পর্শকাতর কনটেন্ট বেশি ছড়িয়ে দিয়ে তারা কনটেন্ট নির্মাতাদের অর্থনৈতিকভাবে উৎসাহিত করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভ্রান্তিকর ভাইরাল কনটেন্ট তৈরি করে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার দৌড় মানুষের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদে অবিশ্বাস তৈরি করবে।