বৈশ্বিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সংকটে
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশ এখন সেই অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস। অন্যদিকে, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের রপ্তানি ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং চলতি অর্থবছরে তা ৪৭-৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতি
শুধু ভিয়েতনামই নয়, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলিও বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত দুই বছরে দেশে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের তীব্র ঘাটতির কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা চরমভাবে হ্রাস পেয়েছে।
কারখানা বন্ধ ও বেকারত্বের প্রভাব
কারখানা বন্ধের ফলে শুধু পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বেকারত্বের এই বৃদ্ধি সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে ১০ মাসই রপ্তানি আয় নেতিবাচক ধারায় ছিল। নতুন রপ্তানি আদেশ প্রাপ্তিও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে দেখা গেছে, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের করণীয়
এই মহাসংকট থেকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে রক্ষা করতে সরকারকে কিছু যুগান্তকারী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, শিল্পকারখানা বাঁচিয়ে রাখার জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প জ্বালানি আমদানির পথ সুগম করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কাজ হারানো দেড় লাখ শ্রমিকের পুনর্বাসন এবং বর্তমান শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে সুষম সংলাপের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
আর্থিক প্রণোদনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
তৃতীয়ত, সংকটাপন্ন কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ঋণের সুদ হ্রাস, ঋণ পুনর্গঠন এবং কর রেয়াতির মতো বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা আবশ্যক। চতুর্থত, তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক বাজারে অংশীদারিত্ব ধরে রাখতে এবং নতুন রপ্তানি আদেশ আকর্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত সুবিধা (Duty-Free Access) ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা বেগবান করতে হবে।
লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি
পঞ্চমত, চট্টগ্রাম বন্দরসহ সকল স্থল ও বিমান বন্দরের লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে পণ্য খালাস এবং জাহাজিকরণে কোনো বিলম্ব না হয়। আমদানি করা কাঁচামাল ছাড়করণের প্রক্রিয়া সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত করা জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
এছাড়া আরও কিছু সুপারিশ রয়েছে, যার বাস্তবায়ন জরুরি। যেমন, প্রচলিত তুলাভিত্তিক পোশাকের (কটন) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম ফাইবার বা সিনথেটিক কাপড়ের (নন-কটন) উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর কথা ভাবতে হবে। শুধু প্রচলিত বাজার বা আমেরিকা-ইউরোপের ওপর নির্ভর না করে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হবে। একই সঙ্গে কারখানায় নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে হবে এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর (অটোমেশন) উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করে অপচয় রোধ ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
শেষ কথা
মনে রাখতে হবে, তৈরি পোশাকশিল্প শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার নয়, এটি দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এবং নারীর ক্ষমতায়নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়লে দেশের সমগ্র অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। অতএব, বর্তমান সরকার কালক্ষেপণ না করে দূরদর্শী ও কঠোর নীতিমালার মাধ্যমে এই সংকট উত্তরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে—এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।



