রাজশাহীর তানোরে নারীদের চুলে কোটি টাকার ব্যবসা
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় নারীদের উচ্ছিষ্ট চুল সংগ্রহ করে সপ্তাহে কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এই চুল চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, জাপান ও কোরিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে, যেখানে পরচুলা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তানোরের কামারগাঁ ও কলমা ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে গড়ে ওঠা চুলের কারখানায় কয়েক হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
চুলের হাট ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র
তানোর উপজেলার চৌবাড়িয়া বাজার ঘিরে শতাধিক চুলের আড়ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে সপ্তাহে ছয় দিন হাট বসে, যেখানে প্রতিদিন অন্তত ৩ লাখ টাকার চুল কেনাবেচা হয়। পাশাপাশি, তানোর, নওগাঁর মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলায় ক্ষুদ্র পরিসরে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বাড়ি বাড়ি চালু এসব কেন্দ্রে গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র নারীরা কাজ করছেন।
ফেরিওয়ালারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে নারীদের সংরক্ষিত চুল সংগ্রহ করেন, যা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চুল পরিষ্কার করে বাছাই করা হয়, তারপর চৌবাড়িয়া হাটে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। চুলের দাম কেজি সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে, বিশেষ করে ১২ ইঞ্চির বেশি লম্বা চুলের ক্ষেত্রে।
নারী কর্মীদের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ
মাদারীপুরে ছোট-বড় ৮টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে নারী কর্মীরা প্রধানত চুল জট ছাড়ানোর কাজ করেন। তারা দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি পান, যা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সচ্ছলতা ফিরছে। নারী কর্মী সাবিনা বেগম বলেন, "আমরা চুল থেকে নোংরা ও জট আলাদা করি, পরে পুরুষ কর্মীরা পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে বিক্রির উপযোগী করেন।"
তবে, কাজের সময় জটবাঁধা চুলের ময়লা নাক-মুখে প্রবেশ করে সর্দি-কাশির সমস্যা সৃষ্টি করে। নিপা বেওয়ার মতো কর্মীরা এলাকায় কাজের অভাবের কারণে এ পেশায় রয়েছেন। গৃহিণী, কৃষাণি ও শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে এ খাতে যুক্ত হচ্ছেন।
ব্যবসার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
চুল ব্যবসায়ীরা জানান, ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে কেজি ৩ হাজার ৫০০ টাকায় চুল কেনা হয়, প্রক্রিয়াজাতকরণের পর ওজন কমে ৬৫০ গ্রাম হয় এবং তা কেজি ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। চৌবাড়িয়া হাটে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ কেজি চুল বিক্রি হয়, মোট লেনদেন প্রায় ৩ লাখ টাকা। ব্যবসায়ী রায়হান আলী বলেন, "দিনদিন বেচাকেনা জমজমাট হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চুলের চাহিদা বাড়ছে।"
তবে, তানোর উপজেলার কামারগাঁ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন প্রামাণিকের মতে, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এ অঞ্চলে চুল ব্যবসা আলাদা শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে, তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিয়াকত সালমান বলেন, "এটি সম্ভাবনাময় খাত, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও সুবিধা পেলে এ খাত আরও এগিয়ে যাবে।"
