মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত: বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এই বাজারটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই হাজার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে এই অঞ্চলে পণ্য পাঠিয়ে থাকে। তবে গত দুই সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ থাকায় এসব রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুসারে, গত অর্থবছরে পারস্য উপসাগরীয় আট দেশে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা ১ হাজার ৮২৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।
ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা
এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ১ হাজার ৮২৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৮০টি এমন রয়েছে যাদের মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ২৯.২৭ কোটি ডলার। রপ্তানিকারক ও গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের রপ্তানিকারক প্রথমে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তারপর মধ্যপ্রাচ্যকে প্রধান গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন। সক্ষমতা বাড়লে পরবর্তীতে তারা ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বাজারে প্রবেশ করেন। গত বছর ভারতের বিধিনিষেধে ছোট রপ্তানিকারকরা একবার বড় ঝুঁকিতে পড়েছিলেন, এবং সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট তাদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
যুদ্ধের প্রভাবে পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়েছে। এর ফলে সমুদ্রপথে কার্যত রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। এই সংকট ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরবের বড় অংশ এবং ওমানের মতো দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে। যদিও সীমিত পরিসরে বিমানপথে কিছু পণ্য পাঠানো হচ্ছে, তবে এই আট দেশে মোট রপ্তানির মাত্র ১৯ শতাংশ উড়োজাহাজে পরিবহন করা হয়। বাকি ৮১ শতাংশই সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়, যা এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
বিভিন্ন শিল্পের উপর প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ও তৈরি পোশাকবিহীন দুই ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়। গত অর্থবছরে এই অঞ্চলে তৈরি পোশাক ছাড়া ৪৯৩ ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে প্রধান ছিল:
- পাটজাত পণ্য
- বিস্কুট ও পানীয়সহ খাদ্যপণ্য
- সবজি ও মসলা
- পানপাতা, তামাক ও জুতা
মসলা ও বিস্কুট এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্য, যার মোট মূল্য প্রায় ১০ কোটি ডলার। ঢাকার আমিনবাজারের ওয়েলকাম ইমপেক্স ফুড অ্যান্ড বেভারেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাজারে সক্রিয়, কিন্তু যুদ্ধের কারণে তাদের উৎপাদন গতি কমিয়ে দিতে হয়েছে এবং অস্থায়ী কর্মীদের ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছে।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও চ্যালেঞ্জ
সমুদ্রপথে রপ্তানি বন্ধ থাকায় পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আলী বেভারেজ অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের অংশীদার মোহাম্মদ ইউনূস সরকার জানান, বিমানে প্রতি কেজি পণ্য পাঠানোর খরচ আগে ১০৭ টাকা থাকলেও এখন প্রায় ১৫০ টাকা হয়েছে। সমুদ্রপথে প্রতি কনটেইনারের ভাড়া আগে ২ হাজার ২০০ ডলার ছিল, যা এখন বেড়ে ৫ হাজার ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে। চট্টগ্রামের প্যাসিফিক সি ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দোদুল কুমার দত্ত উল্লেখ করেন যে, তাদের রপ্তানির সিংহভাগ মধ্যপ্রাচ্যে, এবং জাহাজভাড়া প্রতি কনটেইনারে এক হাজার ডলার বেড়ে যাওয়ায় কার্যাদেশ থাকলেও রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না।
তৈরি পোশাক শিল্পেও প্রভাব
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ১ হাজার ১৪১টি প্রতিষ্ঠান, যার মোট মূল্য প্রায় ৪১ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২৪১টি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির অর্ধেকের বেশি এই অঞ্চলে যায়। ঢাকার ইউনিভার্সাল অ্যাপারেলসের মহাব্যবস্থাপক মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, তাদের কারখানার রপ্তানির পুরোটাই সৌদি আরবে নির্ভরশীল, এবং যুদ্ধের কারণে আগামী শিপমেন্ট অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
ভবিষ্যত সম্ভাবনা ও সুযোগ
জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের তথ্য অনুসারে, পারস্য উপসাগরের সাতটি দেশ ২০২৪ সালে প্রায় ৮৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তুলনামূলক কম হলেও এই বাজারে সম্প্রসারণের বড় সুযোগ রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য একটি সম্প্রসারণশীল বাজার, এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সম্ভাবনা আবারও ফিরে আসবে। তবে বর্তমান সংকটে রপ্তানিকারকদের নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টা চললেও যুদ্ধের প্রভাব অনেক বাজারেই পড়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
