২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে, অপ্রচলিত বাজারে চাপ বাড়ছে
তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে, অপ্রচলিত বাজারে চাপ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রফতানিতে নিম্নগতি: অপ্রচলিত বাজারে চাপ বাড়ছে

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রফতানিতে কিছুটা নিম্নগতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে অপ্রচলিত বা নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারে রফতানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধিতে চাপ তৈরি হয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ২৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার— যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম।

অপ্রচলিত বাজারে রফতানি হ্রাসের কারণ

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বিভিন্ন দেশে ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ার কারণে পোশাকের চাহিদা কিছুটা কমেছে। এর প্রভাব প্রধান বাজারের পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারেও পড়েছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে অপ্রচলিত বাজারে মোট রফতানি হয়েছে ৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম। মোট পোশাক রফতানির প্রায় ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ এসেছে এসব বাজার থেকে।

তবে এই বাজারগুলোর মধ্যেও কিছু দেশে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। যেমন:

  • ব্রাজিলে রফতানি বেড়েছে ২৩ দশমিক ৩১ শতাংশ
  • চীনে বেড়েছে ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ
  • সৌদি আরবে বেড়েছে ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ
  • মালয়েশিয়ায় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ
  • সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ
  • দক্ষিণ আফ্রিকায় বেড়েছে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ

অপরদিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত বাজারে রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যেমন:

  • রাশিয়ায় রফতানি কমেছে ২৯ দশমিক ১৭ শতাংশ
  • তুরস্কে কমেছে ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ
  • মেক্সিকোতে কমেছে ১৬ দশমিক ৮২ শতাংশ
  • অস্ট্রেলিয়াতে কমেছে ১২ দশমিক ৬৮ শতাংশ
  • দক্ষিণ কোরিয়াতে কমেছে ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কিছু দেশের অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং ভোক্তা ব্যয়ের চাপের কারণে এসব বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাব ও সরবরাহ ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর, সুয়েজ খালসহ উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে— যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গত আট মাস ধরেই রফতানি খাত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চাপে রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়া বিশ্ব পোশাক উৎপাদনের একটি বড় কেন্দ্র। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কারখানা থেকে ইউরোপের বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য নিয়মিত পোশাক সরবরাহ করা হয়। জরুরি চালানের ক্ষেত্রে এসব পণ্যের একটি বড় অংশ আকাশপথে পাঠানো হয়। তবে সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর দুবাই কয়েক দিন কার্যত বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় এবং কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইত্তিহাদসহ উপসাগরীয় বড় এয়ারলাইনগুলো বহু যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট বাতিল করেছে। ফলে ওই রুটে নির্ভরশীল পণ্য পরিবহনেও চাপ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের মোট এয়ার কার্গোর অর্ধেকের বেশি উপসাগরীয় হাব হয়ে পরিবাহিত হয়। এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত পোশাকের চালান ঢাকাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আকাশপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথেও ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামী বেশিরভাগ কনটেইনার জাহাজ সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে চলাচল করে। কিন্তু সংঘাতের কারণে ওই রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় অনেক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ পথে ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পৌঁছাতে সময়ও বেশি লাগছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক শিপিং লাইন নতুন বুকিং নেওয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দ্রুত সরবরাহনির্ভর ফ্যাশন শিল্পে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রধান বাজারগুলোর অবস্থা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আলোচ্য সময়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে মোট ১২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে, যা মোট রফতানির প্রায় ৪৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বাজারে রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ইইউর মধ্যে কিছু দেশে রফতানি বেড়েছে। যেমন:

  • স্পেনে বেড়েছে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ
  • পোল্যান্ডে বেড়েছে ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ
  • স্লোভেনিয়াতে বেড়েছে ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ
  • অস্ট্রিয়াতে বেড়েছে ৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ

অপরদিকে কয়েকটি বড় বাজারে রফতানি কমেছে। যেমন:

  • জার্মানিতে কমেছে ১২ দশমিক ২০ শতাংশ
  • ফ্রান্সে কমেছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ
  • ডেনমার্কে কমেছে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ
  • ইতালিতে কমেছে ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ
  • বেলজিয়ামে কমেছে ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে ৫ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বাজারে রফতানি সামান্য কমে ০ দশমিক ৭৪ শতাংশ হয়েছে। প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য ও কানাডায় বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে। এই সময়ে যুক্তরাজ্যে রফতানি হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। আর কানাডায় রফতানি হয়েছে প্রায় ৮৭১ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ বেশি।

পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও নতুন বাজার সম্প্রসারণের তাগিদ

পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাকের দুটি প্রধান উপখাত নিটওয়্যার ও ওভেন— উভয় ক্ষেত্রেই রফতানি কমেছে। নিটওয়্যার রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ওভেন রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে। ফলে রফতানিতে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘দীর্ঘমেয়াদে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে নতুন বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার করাও জরুরি।’’ এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।