মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপে রাজধানীর নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা, লেগুনাচালক ও নিরাপত্তাকর্মীরা জানিয়েছেন, বাজারের দাম বাড়লেও তাঁদের আয় বাড়ছে না, বরং কমছে।
সবজি বিক্রেতা আবদুল আজিজের দুরবস্থা
আবদুল আজিজের বয়স ৬৪ বছর। তিনি রাজধানীর ইন্দিরা রোডের ফুটপাতে বসে সবজি বিক্রি করেন। তাঁর বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায়, বর্তমানে কারওয়ান বাজারের একটি আড়তে শ্রমিকদের সঙ্গে থাকেন। প্রতিদিন সকালে তিনি পাইকারি বাজার থেকে পটোল, শসা বা গাজর কিনে ফুটপাতে বিক্রি করেন। আগে দিনে ৫০০-৭০০ টাকা লাভ হতো; ৮-১০ হাজার টাকা জমলে গ্রামের বাড়িতে যেতেন।
কিন্তু কয়েক মাস ধরে তাঁর হিসাব মিলছে না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, 'পাইকারি বাজারে সবজির দাম বেড়েই চলছে। আগে যে টাকায় এক বস্তা পটোল কিনতাম, এখন তার প্রায় দ্বিগুণ লাগে। খুচরায় বেশি দামে বেচতে গেলে ক্রেতা কমে যায়। লাভের অঙ্কটা অনেক কমে গেছে।'
আবদুল আজিজের স্ত্রী গ্রামে থাকেন; দুই ছেলে ও দুই মেয়ে বিবাহিত। বড় ছেলে এলাকায় সবজি বিক্রি করেন, ছোট ছেলে দোকানের কর্মী। তিনি বলেন, 'বয়স হয়েছে, শরীর আর আগের মতো টানে না। কিন্তু বসে থাকার উপায় নেই। এখন সবজি বেচে সংসার চালানো কঠিন।'
লেগুনাচালক হাদিস মিয়ার সংগ্রাম
মো. হাদিস মিয়া (৩২) রাজধানীর ফার্মগেট-মোহাম্মদপুর পথে লেগুনা চালান। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় একটি টিনশেড ঘরে থাকেন, ভাড়া মাসে সাত হাজার টাকা। মেয়েরা স্কুলে পড়ে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লেগুনার স্টিয়ারিং ধরে থাকেন হাদিস মিয়া। দিনের শেষে আয়ের একটি বড় অংশ বাসাভাড়ায় চলে যায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, 'ঘরভাড়া এখনো বাড়েনি, তবে বাজার তো গরম। চাল-ডাল-তেল কিনতে গিয়েই পকেট খালি হয়ে যায়। মেয়েদের পড়ালেখার খরচসহ অন্যান্য ব্যয় তো আছেই। সংসার চালাতে কখনো কখনো ধারকর্জও করতে হয়।'
প্রতি মাসে তাঁকে নতুন করে হিসাব কষতে হয়—কোথায় খরচ কমানো যায়। দিনে গাড়িবাবদ জমা, গ্যাসসহ অন্য খরচ বাদ দিয়ে তাঁর ৭০০-৮০০ টাকা থাকে। এখন লেগুনার ট্রিপও কমছে, ফলে যাত্রী ও আয় কমে যাচ্ছে। সামনের দিন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন হাদিস মিয়া। তিনি বলেন, 'মেয়ে দুইটার মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, যেভাবেই হোক টিকে থাকতে হবে। কিন্তু বাজারের যে অবস্থা, তাতে তো চলাই কঠিন।'
নিরাপত্তাকর্মী আবদুর রহমানের হাত ফাঁকা
আবদুর রহমান (৪৫) রাজধানীর কুড়িলের যমুনা ফিউচার পার্ক–সংলগ্ন জগন্নাথপুর এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। বছরের বেশির ভাগ সময় ঢাকায় কাটে। ভবনের প্রধান ফটক পাহারা দেওয়া ও বাসিন্দাদের যাতায়াত তদারকি তাঁর নিত্যদিনের কাজ। ভবনের একটি কক্ষে থাকেন তিনি।
তাঁর বর্তমান মাসিক বেতন ১৫ হাজার টাকা। এই বেতন দিয়ে ঢাকায় নিজের খাওয়াসহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে খুব বেশি টাকা গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে পারেন না। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী, স্কুলপড়ুয়া এক ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, 'নিজের খরচ আছে, আবার গ্রামে থাকা পরিবারের জন্য নিয়মিত টাকা পাঠাতে হয়। বেতন সেভাবে না বাড়ায় দুই দিকের চাপ সামলাতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে আছি।'
আবদুর রহমান আরও বলেন, 'আগে মাস শেষে সামান্য হলেও কিছু টাকা বাঁচত। কিন্তু এখন দেখা যায়, মাস শেষে হাত ফাঁকা। বাজারের যে অবস্থা, খরচ যেভাবে বাড়ছে, সামনে আরও কষ্ট হবে।'



