ভৈরবের শ্রমিকরা মে দিবসের গুরুত্ব জানেন না, ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত
ভৈরবের শ্রমিকরা মে দিবসের গুরুত্ব জানেন না

আজ আন্তর্জাতিক মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই দিবসের গুরুত্ব কী, তা জানেন না ভৈরবের শ্রমজীবী মানুষেরা। ফলে বছরের পর বছর কাজ করে গেলেও তারা রয়েছেন অবহেলিত ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত।

শ্রমিকদের অজ্ঞতা ও দৈনন্দিন সংগ্রাম

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত বন্দরনগরী ভৈরব। এখানকার পুরাতন ফেরিঘাট ও নৌকাঘাটসহ শহরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কল-কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে কয়েক হাজার শ্রমজীবী মানুষ। এসব খেটে খাওয়া মানুষ জানে না তাদের অধিকার বলে কিছু আছে। তারা শুধু জানে কাজ করলে পরিবারের পেটে ভাত, আর কাজ না করলে মাথায় হাত।

প্রতি বছর এই দিনে সরকারিভাবে এবং বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষকে নিয়ে সভা, সমাবেশ কিংবা র্যালি করা হয়। কিন্তু এতে বাড়েনি তাদের জীবনযাত্রার মান। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তারা রয়েছেন অবহেলিত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নৌকাঘাটের শ্রমিকদের কথা

ভৈরব বাজার নৌকা ঘাটে প্রায় ৫০ বছর ধরে কাজ করছেন রমিজ উদ্দিন। মে দিবস কী জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতে পারেননি। তার মতে, "কাম করলে পেটে ভাত, আর না করলে মাথায় হাত। এর বাইরে কিছুই বুঝি না।"

ভৈরব মেঘনা ফেরিঘাটের কয়লা শ্রমিক আবদুর রশিদ বলেন, "মে দিবস দিয়ে কী করব? আমরা গরিব মানুষ। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সকাল ৮টায় কাজে আসি, সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে বাসায় ফিরি। প্রতিদিন কাজ করলে মজুরি পাই ৫০০-৬০০ টাকা। এ টাকায় বউ-পোলাপান নিয়ে সংসার চালাই, ভাত খাই। একদিন কাজে না আসলে পেটে ভাত জোটে না।" আট ঘণ্টা কাজ করার বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। একই কথা বলেন আরেক কয়লা শ্রমিক কালু মিয়া।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাদুকা শিল্পের শ্রমিকদের অবস্থা

একই চিত্র ভৈরবের অন্যতম সেক্টর পাদুকা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদেরও। তারাও জানেন না নিজেদের অধিকারের কথা, ফলে মালিকদের ইচ্ছেমতো কাজ করতে হচ্ছে। ভৈরবের প্রায় পাঁচ হাজার পাদুকা কারখানায় ৫০-৬০ হাজার শ্রমিক দিনরাত কাজ করেন। মে দিবসের খবর তাদের অজানা। তারা জানেন, কাজ করলে দৈনিক বেতন মেলে ৪০০-৫০০ টাকা। ঘণ্টার হিসাব নেই। সকাল-সন্ধ্যা কাজ করলে মালিক বেতন দেবেন—এটাই তাদের জানা।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজের সময়সীমা আট ঘণ্টা নির্ধারণ করা থাকলেও মালিকরা যেভাবে পারছেন কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে কখনও ১২ ঘণ্টা, কখনও ১৬ ঘণ্টা কাজ করছেন। অতিরিক্ত ঘণ্টার বেতন দেওয়া হয় না। ফলে ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

পাদুকা শ্রমিক আলমগীর হোসেন বলেন, "মে দিবস মানে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দিন। কিন্তু কে শুনে কার কথা? ন্যায্য মজুরি চাইলেই চাকরি নেই, কাজ থাকে না। সংসার চালাতে কাজ করতেই হয়।"

শ্রমিকদের ডাটাবেইজের প্রয়োজনীয়তা

ভৈরবে পাদুকা শিল্প ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি সেক্টরে লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করলেও সরকারি বা বেসরকারি কোনো পক্ষের কাছেই নেই তাদের তালিকা। তাই শ্রমিকদের জন্য একটি ডাটাবেইজ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করেন ভৈরব পাদুকা কারখানা মালিক সমিতির সভাপতি মো. আল আমিন মিয়া। তিনি একই সঙ্গে শ্রমিকদের দুর্দিন-দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।

শুধু তা-ই নয়, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এসব শ্রমিকদের কল্যাণে নানামুখী উদ্যোগ সরকারিভাবে গ্রহণ করলে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম মামুনুর রশীদ বলেন, "মে দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস। অথচ এ ব্যাপারে শ্রমিকরা সচেতন না। তাই শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনতে এবং তাদের তালিকা তৈরি করতে সবার আগে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাহলেই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।"