দেশের শীর্ষ বাণিজ্যিক সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তির করমুক্ত আয় সীমা বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবটি বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর পান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উপদেষ্টা কমিটির ৪৬তম সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
সভাটি যৌথভাবে আয়োজন করে এনবিআর এবং এফবিসিসিআই। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এবং সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে প্রস্তাব
এফবিসিসিআই তাদের উপস্থাপনায় জানায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাসের প্রেক্ষাপটে করমুক্ত আয় সীমা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সংগঠনটি প্রস্তাব করেছে যে সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয় সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হোক, আর বয়স্ক নাগরিক ও নারী করদাতাদের জন্য সীমা ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হোক।
একইসঙ্গে এফবিসিসিআই ব্যক্তিগত করের সর্বোচ্চ হার ২৫ শতাংশ নির্ধারণেরও সুপারিশ করেছে। বর্তমানে ব্যক্তির করমুক্ত আয় সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের মতে, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় কর কাঠামোতে এই সমন্বয় সময়োপযোগী হবে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগামী জাতীয় বাজেটে ব্যবসায়ীরা যত বড় ছাড় আশা করছেন, তা আয়কর ও ভ্যাটে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, ব্যবসা পরিচালনার বিদ্যমান সব বাধা দূর করা হবে।
তিনি বলেন, 'করেজাতে বড় ছাড় দেওয়া সম্ভব না হলেও, ব্যবসা করার সব বাধা আমরা দূর করতে চাই। বেসরকারি খাতের বিকাশ দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।'
চট্টগ্রাম বন্দরের চার্জ ৪০ শতাংশ বাড়ানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যবসাবান্ধব নয়। 'বন্দরে দুর্নীতি ও ব্যবসা করার প্রতিবন্ধকতা দূর করা হবে। ব্যবসায়ীরা আগামী তিন মাসের মধ্যে তাদের সমস্যা জানালে দ্রুত সমাধান দেওয়া হবে,' বলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে সময় চাওয়া হয়েছে। 'আমরা আইএমএফকে বলেছি, দুই বছরের সময় প্রয়োজন। তৃতীয় বছর থেকে অর্থনীতি গতি পাবে,' বলেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন সরকারকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়েছে। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত ভালো করলেও অন্যান্য খাত পিছিয়ে থাকার কারণ পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দিয়ে সেগুলো এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বড় ব্যবসায়ীদের মূলধন সংকটের বিষয়টি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংককে জানানো হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে কার্যকর অবকাঠামো খাতে মানসম্পন্ন বিনিয়োগে জোর দেওয়া হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যানের আশ্বাস
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, ব্যবসায়ীদের জন্য কর ও শুল্ক সহজ করতে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও জটিল বিধিনিষেধ কমিয়ে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার আশ্বাস দেন তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ব্যবসায়ীরা এগিয়ে গেলে দেশের অর্থনীতিও এগিয়ে যাবে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। আগামী বাজেট প্রণয়নে যতটা সম্ভব সহায়ক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, যেসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা জটিল বিধিনিষেধ রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে সমাধান করা হবে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সমস্যাগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে এনবিআর।
রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও ব্যবসাবান্ধব করতে কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তারা যাতে সহজেই কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন, সেজন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান কর আওতা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, রাজস্ব আদায়ে বৈষম্য দূর করতে গোটা জাতির মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।



