জ্বালানি তেলের দামে অতিষ্ঠ পরিবহনশ্রমিকেরা, ভাড়া বৃদ্ধির দাবি
জ্বালানি তেলের দামে অতিষ্ঠ পরিবহনশ্রমিক, ভাড়া বৃদ্ধির দাবি

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন পরিবহনশ্রমিকেরা। দিনাজপুর বাস টার্মিনালে বুধবার বিকেলে চিশতীয়া গাড়ির সুপারভাইজার মো. লিটন (৪৩) বলেন, 'সকাল সাড়ে সাতটায় হিলি থেকে দিনাজপুর আসছি। এই ট্রিপে ভাড়া পেয়েছি ২ হাজার ৭০০ টাকা। সাড়ে ১০টায় পাম্পে লাইন দিয়ে তেল পেয়েছি দুপুর একটায়। ফিরতি সিরিয়াল পেয়েছি তিনটায়। এর মধ্যে তেল কিনতে গেছে সাড়ে চার হাজার টাকা। মহাজনের চালান বাকি, স্টাফ আছি তিনজন। যাত্রীও কমে গেছে। এই ট্রিপে কত আসবে জানি না। চালানে টিকছে না, নিজে কী খাবো, মহাজনকে কী দেবো।'

তেলের সংকটে ভোগান্তি

তিনি জানান, কিছুদিন আগেও দিনাজপুর থেকে হিলি দিনে চারবার যাতায়াত করতে পারতেন। এখন পাম্পে অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের কারণে দুবার যাতায়াত করছেন। জ্বালানি খরচ ও মালিককে টাকা দেওয়ার পর গড়ে প্রত্যেক কর্মচারী ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পেতেন। এখন খাবার খরচ ওঠানোই দায়। তিনি বলেন, 'ভাড়া না বাড়ালে আর তেলের সংকট না কাটলে বাস চালানো বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।'

শুধু হিলি কাউন্টারই নয়; বাস টার্মিনালে রংপুর-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় তিন কাউন্টারের কয়েকজন চালক ও সুপারভাইজার প্রায় একই কথা বলছেন। পঞ্চগড় কাউন্টারের সুপারভাইজার আবদুল জলিল বলেন, 'সাধারণ সময়ে পঞ্চগড় থেকে দিনাজপুর যাওয়া-আসায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা পেতাম। ছয় হাজার টাকার তেল খরচ বাদ দিয়ে যা থাকত, স্টাফ-মালিকের দিন চলে যেত। অথচ আজকের ট্রিপটা আসলাম ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। যাওয়ার সময় কত হয় আল্লাহ জানে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যাত্রী কমে আয় কমেছে

একদিকে ডিজেল প্রতি লিটারে বাড়তি ১৫ টাকা ২৫ পয়সা। আবার দাম বাড়লেও পাম্পে একবার তেল নিতে গেলে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় বেশি লাগছে। কাউন্টারে ও বাসে যাত্রীদের সঙ্গে সুপারভাইজারের বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে যাত্রী কমে যাওয়ায় আয় কমেছে তাদের। পরিবহনশ্রমিকেরা বেশ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন বলে জানান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রংপুরের মুন্না এন্টারপ্রাইজের চালক চান মিয়া বলেন, 'এই কয়েক দিনে তেল নিতে না পারায় দুই দিন গাড়ি বসিয়ে রেখেছি। রাত ১২টা পর্যন্ত পাম্পে অপেক্ষা করে পরে শুনলাম তেল নেই। এত খাটাখাটনি করে যদি দুটো টাকার মুখ দেখতাম, তা-ও কথা ছিল। সারা দিন বাস চালাই, রাতে তেলের জন্য অপেক্ষা। তেলের দাম যে বাড়ছে, অধিকাংশ যাত্রী বুঝতেও চায় না।'

ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ

দিনাজপুর থেকে পঞ্চগড়ে নির্ধারিত ভাড়া ২১০ টাকা। কাউন্টারে নেওয়া হতো ২০০ টাকা। অনেকে ১৮০ টাকা দিয়েও পঞ্চগড় গেছেন। সুপারভাইজার জলিল বলেন, 'ভাড়া বাড়াইনি। কিন্তু অনেক সময় যাত্রী আগের ভাড়াটা দিতেও কাবজাব করেন। তবে বেশির ভাগ যাত্রীই বিষয়টি বুঝছেন। সরকারের সমালোচনা করলেও ন্যায্য ভাড়াটাই দিচ্ছেন।'

যদিও রংপুর ও পঞ্চগড় কাউন্টারের কয়েকজন যাত্রী বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেন। রিফাত নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, 'রংপুর থেকে দিনাজপুর নিয়মিত যাতায়াত করতাম ১৫০ টাকা করে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আজকে ১৭০ টাকা ভাড়া দিতে হলো।' পঞ্চগড় কাউন্টারের এক নারী যাত্রী বলেন, 'দুজন যেতাম, অনেক সময় ৩৫০ টাকা দিতাম। আজকে ৪০০ টাকা দিতে হলো।'

মালিকদের দাবি

শুধু জ্বালানি তেলের দামই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে লুব্রিকেন্টের দামসহ পরিবহনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার কথা জানান কয়েকজন বাসের মালিক। তারা বলছেন, আগে যে নাট কিনতেন ২০ টাকা, সেটা এখন ৩৫ টাকা হয়েছে। প্রতিটি টায়ারের দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে। ভাড়া না বাড়ালে লোকসান করে কত দিন ব্যবসা ধরে রাখা যাবে, এমন প্রশ্নই তুলছেন তারা।

এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ। বুধবার দুপুরে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক এবং জেলা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।

দিনাজপুর সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক শাহেদ রিয়াজ চৌধুরী বলেন, 'শুধু ডিজেল নয়, সবকিছুর দাম বাড়তি। এমনিতেই কয়েক বছর ধরে পরিবহন ব্যবসায় মন্দা চলছে। বর্তমানে দেশে প্রয়োজনের তুলনায় জ্বালানি অপ্রতুল, সেই সঙ্গে লিটারপ্রতি মূল্য বেড়েছে ১৫ টাকা ২৫ পয়সা। বিগত সময়ে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পর পরিবহনের ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছিল। আমরা সরকারের কাছে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি উত্থাপন করেছি এবং পরিবহন খাতকে সচল রাখতে সুদৃষ্টি কামনা করছি।'

সরকারের ভাড়া সমন্বয়

এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এবং আন্তজেলা বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই তথ্য জানান। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার বাসের ভাড়া সমন্বয় করল।