বাসভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাবে 'গায়েবি' খরচের অভিযোগ, যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নেতৃত্বাধীন বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণ কমিটি কিলোমিটারপ্রতি ২২ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে, যদিও শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি বিবেচনায় নিলে এই বৃদ্ধি হওয়ার কথা মাত্র ১৫ পয়সা। মালিকপক্ষের চাপে কমিটি ডিজেলের বাইরে বিভিন্ন 'গায়েবি' খরচ যোগ করে ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মালিকপক্ষের চাপে ভাড়া নির্ধারণ
ভাড়া পুনর্নির্ধারণ কমিটির সদস্য ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধি বাহাদুর সাজেদা আক্তার জানান, মালিকপক্ষ শুধু ডিজেলের বাড়তি দাম নয়, বরং খুচরা যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিন অয়েল, টায়ার, টিউব, লুব্রিকেন্টস ও বাসের চেসিসের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে বাড়তি ভাড়া নির্ধারণে সরকারকে চাপ দিচ্ছে। তিনি বলেন, "আমরা ভাড়া না বাড়ানোর কথা বলেছিলাম। একান্ত প্রয়োজন হলে শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি বিবেচনায় নিতে বলেছিলাম। কিন্তু অন্যান্য খরচ যোগ করে বাড়তি ভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে।"
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উল্লেখ করেন, সরকার জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালে ভাড়া বাড়ানোর আলোচনাই এখন আসত না। মালিকেরা মূলত এই সুযোগ নিচ্ছেন, যেমন ২০২২ সালেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর একই কৌশলে বাড়তি ভাড়া নির্ধারণ করেছিলেন এবং পরে ঢাকা শহরে তার চেয়েও বেশি আদায় শুরু করেন।
নতুন ভাড়ার হার ও যৌক্তিকতা প্রশ্ন
বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪২ পয়সা। নতুন ভাড়ার হার কার্যকর হলে কিলোমিটারে ভাড়া দাঁড়াবে ২ টাকা ৬৪ পয়সা। অন্যদিকে দূরপাল্লার পথে বর্তমান ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা; তা বাড়িয়ে ২ টাকা ৩৪ পয়সা প্রস্তাব করা হয়েছে।
যাইহোক, বিআরটিএর কমিটি যে বাড়তি ভাড়া প্রস্তাব করেছে, তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কমিটি বাস-মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণে যে ব্যয় বিশ্লেষণ করে, তাতে অনেক 'গায়েবি' ব্যয় যুক্ত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ:
- ভাড়া নির্ধারণের সময় বলা হয়েছে, বাসগুলো প্রতি ২৫ দিনে এবং ৩ মাসে মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, যার জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৬১ হাজার টাকা। কিন্তু ঢাকার বাসগুলোর পেছনে এমন ব্যয় করা হচ্ছে, তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
- নগর পরিবহনের বাস গ্যারেজ ও টার্মিনালে রাখার জন্য আলাদা ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা, অথচ ঢাকার কোনো বাসের জন্য আলাদা গ্যারেজ নেই।
- এক বছর পরপর ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ ধরা হয়েছে, যা বাস্তবে অনুপস্থিত বলে অভিযোগ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রহিম বকস বলেন, "বাসের ভাড়া নির্ধারণের সময় অনেক কিছুই লেখা হয়। কিন্তু শ্রমিকেরা তা পায় না। শ্রমিকেরা বাস চালালে টাকা পায়, নইলে নয়।"
অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান অবস্থা
২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। তখন বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৪০ পয়সা বা ২২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে সরকার। গত শনিবার ডিজেলের দাম বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৫ টাকা করা হয়েছে, অর্থাৎ ২০২২ সালের পর ডিজেলের দাম লিটারে মাত্র এক টাকা বেড়েছে।
অতীতে ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর হয়নি। যেমন ২০২২ সালে ডিজেলের দাম কমানোর পর ভাড়া ৫ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সরকার, কিন্তু পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা তা মানেননি। একইভাবে ২০২৪ সালে ভাড়া ৩ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাসভাড়া সমন্বয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ বৃহস্পতিবার হতে পারে বলে জানা গেছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সরকারের উচ্চপর্যায়ে কথা বলতে চান, তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হতে পারে।
কমিটির গঠন ও মতামত
ভাড়া পুনর্নির্ধারণ কমিটির সদস্য ১১ জন, যার মধ্যে মালিকপক্ষের কার্যত চারজন রয়েছেন, আর যাত্রীদের প্রতিনিধি মাত্র একজন—ক্যাবের আইনজীবী বাহাদুর সাজেদা আক্তার। বৈঠকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি কে এম তৌফিকুল হাসান বলেন, অন্যান্য ব্যয় আমলে না এনে শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা উচিত।
যাইহোক, অন্য সদস্যদের প্রায় সবাই জ্বালানির বাইরের অন্যান্য খরচ ধরে ভাড়া বৃদ্ধির পক্ষে মত দেন, এবং বিআরটিএ সেভাবেই প্রস্তাব তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। বিআরটিএর চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমর বলেন, "ভাড়া এমনভাবে বাড়ানো হবে না, যাতে মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার অতিরিক্ত ভাড়া নির্ধারণের মাধ্যমে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিলে তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।"
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সরকারের উচিত পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অতীতের ব্যয়ের তালিকা যাচাই করা এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠক করে যৌক্তিক বাসভাড়া নির্ধারণ করা। বাহাদুর সাজেদা আক্তার সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "মানুষ এমনিতেই কষ্টে আছে। বাড়তি বাসভাড়া তাদের জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হবে।"



